সচল করার দাবি স্থানীয়দের
৩৫০ একর জমি থাকলেও অকেজো কালিয়াচাপড়া চিনিকল
Printed Edition
আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি
৩৫০ একর বিশাল ভূমির ওপর নির্মিত কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক কালিয়াচাপড়া চিনিকলটি দীর্ঘ দুই দশক ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এক সময়ের এই লাভজনক ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিলটির বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করতে আগামী ৬ মে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের কথা রয়েছে। অন্য দিকে, শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, পর্যায়ক্রমে দেশের বন্ধ সব চিনিকল পুনরায় চালু করার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও উত্থান-পতন
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬৫ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আবদুল মোনেম খানের উদ্যোগে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রচেষ্টায় কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলার সংযোগস্থলে মিলটির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৬৮ সালে প্রায় ১২৫০ জন শ্রমিক নিয়ে উৎপাদন শুরু করে এই মিল। তৎকালীন ১১টি চিনিকলের মধ্যে এটি ছিল অন্যতম। তবে মিলটির ইতিহাসে সোনালী অধ্যায় ছিল ১৯৭৮-৭৯ অর্থবছর; শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবারের মতো লাভের মুখ দেখেছিল। তিনি ১৯৭৮ সালের মে মাসে মিলটি পরিদর্শন করে এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অডিটোরিয়ামে আর্থিক অনুদানও দিয়েছিলেন। ময়মনসিংহের নান্দাইল, নরসিংদীর মনোহরদী এবং কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকাসহ মোট ১৬টি আখ সংগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে মিলটিতে কাঁচামাল সরবরাহ করা হতো। গচিহাটা রেলস্টেশন থেকে রেলপথে উৎপাদিত চিনি সরবরাহ করা হতো সারা দেশে।
বন্ধ হওয়া ও মালিকানা পরিবর্তন
সময়ের ব্যবধানে বোরো ধান চাষের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি, আখের ন্যায্য মূল্য পেতে বিলম্ব এবং শ্রমিক সঙ্কটের কারণে মিলটি লোকসানের মুখে পড়ে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার মিলটি ‘লে-অফ’ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে শুধুমাত্র চিনি উৎপাদনের শর্তে নিটল-টাটা গ্রুপের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়।
শর্তানুসারে তারা কয়েক বছর চিনি উৎপাদন করলেও ২০০৯ সালে লোকসানের অজুহাতে আবারো উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর পর সেখানে ট্রাক সংযোজন, গার্মেন্টস ও ড্রাইভিং স্কুল চালুর চেষ্টা করা হলেও শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে এবং কোনো উদ্যোগই স্থায়ী হয়নি।
বর্তমান অবস্থা ও ইপিজেড প্রস্তাব : বর্তমানে মিলটির অনেক মূল্যবান জমি বিক্রি হয়ে গেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মাত্র ৩০-৪০ জন কর্মচারী দিয়ে বিশাল এই স্থাপনাটি রক্ষণাবেক্ষণ করা হচ্ছে। মিলের প্রবীণ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান আক্ষেপ করে বলেন, ‘১৯৯৩ সালেও যেখানে ৬০০ শ্রমিক ও ১৪১ জন ফিল্ড অফিসার ছিল, আজ সেখানে শুধুই হাহাকার।’ এ দিকে, সরকার কিশোরগঞ্জে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) স্থাপনের ঘোষণা দিলে এই চিনিকলের জায়গায় তা নির্মাণের দাবি ওঠে। স্থানীয়রা মনে করেন, মিলটি পুনরায় চালু হলে বা এখানে ইপিজেড হলে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যহ : কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এই মিলের সাথে আমাদের আবেগ ও ঐতিহ্য জড়িয়ে আছে। মিলের বর্তমান মালিকানা এবং এটি সচল করার আইনি জটিলতা নিরসনে আমরা কাজ করছি। আগামী ৬ মে আমি স্থানীয়দের সাথে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবো।’ শিল্প সচিবের একান্ত সহকারী (পিও) জানান, সরকার বন্ধ থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করছে। কালিয়াচাপড়া চিনিকলের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব বা লিখিত আবেদন পেলে মন্ত্রণালয় থেকে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে আবারো আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করা হলে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করলে এই চিনিকলটি আবারো দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।