সীমানা জটিলতার ফাঁদে বয়ারচর নাগরিক সেবা বঞ্চিত লক্ষাধিক মানুষ

Printed Edition

রেজাউল হক রামগতি (লক্ষ্মীপুর)

  • মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি
  • জরুরি চিকিৎসা পেতে পাড়ি দিতে হয় ২০ কিলোমিটার পথ

মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল বয়ারচর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর হলেও এখানকার মানুষের জীবন বাস্তবতায় রয়েছে দুঃসহ সংগ্রাম ও বঞ্চনা। লক্ষাধিক মানুষের বসবাসের এই চরটি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সীমানা বিরোধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনি, প্রশাসনিক ও নাগরিক সেবা থেকে কার্যত বঞ্চিত হয়ে পড়ছেন এখানকার বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সাথে সরেজমিনে কথা বলে জানা গেছে, সীমানা জটিলতার কারণে বয়ারচরে কোনো মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। একেকটি ওয়ার্ডে ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষের বসবাস থাকলেও অধিকাংশ এলাকায় নেই কোনো বিদ্যালয়। ফলে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তারা। একইভাবে পুরো চরে নেই কোনো সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রও। জরুরি চিকিৎসা পেতে বাসিন্দাদের পাড়ি দিতে হয় প্রায় ২০ কিলোমিটার পথ। এর পর যেতে হয় রামগতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

ভৌগোলিকভাবে বয়ারচরের দুই পাশে মেঘনা নদী এবং এক পাশে ভুলুয়া নদী। রামগতি উপজেলা সদরের সাথে একটি সড়ক যোগাযোগ থাকলেও সেটি চলাচলের অনুপযোগী। বর্ষা মৌসুমে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভঙ্গুর হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে, বিশেষ করে প্রসূতি মা বা গুরুতর অসুস্থ রোগীদের মূল ভূখণ্ডে নেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ ছাড়া মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা থেকেও অনেকাংশে জনপদ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমানা বিরোধের অজুহাতে রামগতি ও হাতিয়া- এই দুই উপজেলা প্রশাসনই উন্নয়ন কার্যক্রমে অনীহা দেখায়। ফলে রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্টসহ অবকাঠামো একেবারেই নাজুক অবস্থায় রয়েছে এ অঞ্চলে। বর্ষা মৌসুমে ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে জলাবদ্ধতা বাড়ে, আবার নদীভাঙনও নিয়মিত দুর্ভোগ হয়ে দেখা দেয়।

নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে বয়ারচরে সক্রিয় রয়েছে একাধিক জলদস্যু, ভূমিদস্যু ও ডাকাত চক্র। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, এমনকি খুন-ধর্ষণের ঘটনাও অহরহ ঘটছে বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। এ দিকে চরে থাকা দুইটি পুলিশ ফাঁড়িতে বর্তমানে কোনো সদস্য মোতায়েন নেই। এতে পুরো জনপদ কার্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির বাইরে রয়েছে।

তেগাছিয়া বাজার এলাকার বাসিন্দা মো: ফারুক বলেন, দুইটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও সেখানে কোনো পুলিশ নেই। আমরা সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রশাসনের কাছে গেলে তারা সীমানা বিরোধের অজুহাত দেখান। একই এলাকার স্কুলশিক্ষক শরীফ মাহমুদ বলেন, রামগতিতে গেলে বলা হয় হাতিয়ায় যান, আবার হাতিয়ায় গেলে বলা হয় রামগতিতে যান। এভাবে আমরা উভয় উপজেলা প্রশাসন থেকেই প্রত্যাখ্যাত ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। আরেক বাসিন্দা মো: মামুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রশাসন থেকে আমরা কোনো নাগরিক সুবিধাই পাই না। কোনো সমস্যা নিয়ে থানায় বা প্রশাসনের কাছে গেলে সমাধান মেলে না।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, বয়ারচরের অধিকাংশ বাসিন্দা রামগতির ভোটার হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ চর নিয়ে রাজনৈতিক টানাপড়েন চলছে। চরগাজী ইউনিয়নের সদস্য শেখ ফরিদ ও ইব্রাহিম খলিল দিদার বলেন, আদালতের রায়ে বয়ারচর রামগতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। বরং রাজনৈতিক স্বার্থে বিষয়টি জিইয়ে রাখা হচ্ছে।

চরগাজী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তাওহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, বয়ারচরের মানুষ রামগতির ওপরই নির্ভরশীল। কিন্তু কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে সীমানা জটিলতা তৈরি করে রেখেছে। তিনি জানান, তবে বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যরা উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। রামগতি থানার ওসি লিটন দেওয়ান বলেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চল। দস্যুবাহিনীর ঝুঁকি থাকায় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পুলিশ সরানো হয়েছে। সীমানা বিরোধ মীমাংসা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুনরায় দায়িত্ব পালন করবে।

লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, প্রায় তিন দশক ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান। অতীতে সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হলেও এবার আমরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সাথে আলোচনা চলছে।

তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বয়ার চরের মানুষ আরো দীর্ঘ সময় ধরে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। তারা অবিলম্বে সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।