চিকিৎসকের জবানবন্দী

হেলিকপ্টার থেকে গুলি : মাথায় ঢুকে বেরিয়ে যায় পিঠ দিয়ে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার; মানবতাবিরোধী অপরাধ

চিকিৎসায় বাধা দেন তৎকালীন সরকার সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ তথা স্বাচিপ চিকিৎসকরা। এমনকি সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে জুলাই ‘যোদ্ধাদের’ সেবা দিতেও বারণ করা হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
ICT

জুলাই আন্দোলনকারীদের গুলি করা হয়েছিল উঁচু জায়গা বা হেলিকপ্টার থেকে। আর এসব গুলি কারো কারো মাথায় লেগে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়। তবু তাদের চিকিৎসায় বাধা দেন তৎকালীন সরকার সমর্থিত স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ তথা স্বাচিপ চিকিৎসকরা। এমনকি সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে জুলাই ‘যোদ্ধাদের’ সেবা দিতেও বারণ করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষীর ডায়াসে দাঁড়িয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন ডা: মোস্তাক আহমেদ। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ক্যাজুয়ালিটি বিভাগের আবাসিক সার্জন হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে ২৭ নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন এই চিকিৎসক। তার জবানবন্দী রেকর্ড করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল। ট্রাইব্যুনালের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মোহিতুল হক চৌধুরী।

জবানবন্দীতে ডা: মোস্তাক বলেন, ‘২০২৪ সালের ১৯, ২০, ২১ জুলাই ও ৪-৫ আগস্ট সবচেয়ে বেশি সংখ্যক গুলিবিদ্ধকে চিকিৎসা দেই আমরা। ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে চাকরির সুবাদে আগেও অনেক গুলিবিদ্ধের সেবা দিয়েছি। তবে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে আহতদের ধরন ছিল কিছুটা ভিন্ন। তাদের গুলির ডিরেকশন ছিল উপর থেকে নিচের দিকে। সাধারণত ডিরেকশন থাকে নিচ থেকে উপরে বা সমান্তরাল।’

আহতদের বরাতে সাক্ষী বলেন, রোগীদের কোনো উঁচু জায়গা বা হেলিকপ্টার থেকে গুলি করা হয়েছে। কোনো কোনো আহতের মাথায় গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। এ ছাড়া আন্দোলন চলাকালীন একদিন বাবা-ছেলে দুইজনই গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে আসেন। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বাবা মারা যান। এতে ছেলে আক্ষেপ করে বলেন- ‘বাবাকে বাঁচাতে পারলাম না।’ এমন ঘটনার সাক্ষী তিনি নিজেই হয়েছেন বলে জবানবন্দীতে তুলে ধরেন।

তিনি আরো বলেন, ‘আহতদের বেশির ভাগের বয়স ছিল ২০-৩০ বছরের মধ্যে। তবে আন্দোলন চলাকালে শহীদুল্লাহ হল সংলগ্ন গেট দিয়ে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে পরিচয় জানতে চাইতেন ছাত্রলীগের ছেলেরা। ছাত্র পরিচয় পেলে ঢুকতে বাধা দিতেন তারা। এ ছাড়া চিকিৎসা চলাকালে ছাত্রলীগের সশস্ত্র কর্মীরা হাসপাতালে ঢুকে খোঁজখবর নিতেন আহতরা কারা। তখন গুলিবিদ্ধ ছাত্ররা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার জন্য আমাদের অনুরোধ করেন।’

স্বাচিপ চিকিৎসকদের নিয়ে ডা: মোস্তাক বলেন, ‘গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের চিকিৎসা দিতে আমাদের অতিউৎসাহী হতে বারণ করেন আওয়ামী লীগ সরকার সমর্থিত স্বাচিপের কিছু চিকিৎসক। তারা বলেন- ‘এরা সন্ত্রাসী। এদের চিকিৎসা দেওয়া যাবে না।’ এমনকি গুলিবিদ্ধ ছাত্রদের চিকিৎসা দেয়ায় গত বছরের ২৫ জুলাই আমাদের পাঁচজন চিকিৎসককে অন্যত্র বদলি করা হয়। আহতদের চিকিৎসায় বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যেই তাদের বদলি করা হয়েছে।’ এ সময় জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে নৃশংসতার জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দায়ী করেন ঢামেক হাসপাতালের এই চিকিৎসক। একই সাথে আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিতদের বিচার ও শাস্তি দাবি করেন তিনি।

আদালতে আরো ২ জন চিকিৎসকের সাক্ষ্য : ডা: মোস্তাক আহমেদের আগে এ মামলায় ট্রাইব্যুনালে মঙ্গলবার সাক্ষী দিয়েছেন আরো দুইজন চিকিৎসক। তাদের একজন মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মফিজুর রহমান ও আরেকজন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা: মনিরুল ইসলাম।

প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে বক্তব্য দেন মিটফোর্ড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা: মফিজুর রহমান। তিনি জানান, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন, হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা: মালিহা তাবাস্সুমের উপস্থাপনায়, আন্দোলনে আহত তিনজন রোগীর শরীর থেকে বের করা তিনটি গুলি জব্দ করেন। এই গুলিগুলো জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের শরীর থেকে বের করা হয়। জব্দ তালিকায় হাসপাতালের ওয়ার্ড মাস্টার মো: সাজ্জাদ হোসেনের স্বাক্ষর রয়েছে, যা তিনি (ডা: মফিজুর) চেনেন এবং তার নিজের স্বাক্ষরও তালিকায় রয়েছে।

দ্বিতীয় সাক্ষী ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের সহকারী সার্জন ডা: মনিরুল ইসলাম। তিনি জানান, সহকারী পরিচালক ডা: মো: আব্দুর রহমানের উপস্থাপনায়, তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় বুলেট ও পিলেট বিদ্ধ হয়ে আসা রোগীদের শরীর থেকে বের করে রাখা মোট ২৩টি বুলেট, পিলেট ও বুলেটের খণ্ডাংশ জব্দ করেন। এই জব্দ তালিকায় তার (ডা: মনিরুল) স্বাক্ষর রয়েছে। তিনি আরো জানান, অপর সাক্ষী হিসেবে ডা: মো: ইদ্রিস, মেডিক্যাল অফিসার, ক্যাজুয়ালটি বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার (মনিরুলের) সামনে স্বাক্ষর করেছেন এবং তিনি তার (ইদ্রিসের) স্বাক্ষর চিনেন।

এ দিন তিনজনের সাক্ষী গ্রহণের পর দুপুরের খাবারের বিরতি দিয়ে আরো দুইজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। তারা হলেন ফেনীর ব্যবসায়ী আহত নাসির উদ্দিন ও শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের নানা মো: সাঈদুর রহমান। এর মধ্যে শহীদ আনাসের নানা রাজধানীর চাঁনখারপুলে পুলিশের গুলিতে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় করা মামলার সাক্ষী।

সাঈদুর রহমান ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি সাক্ষীর ডায়াসে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি ব্যবসা করি। আমি জুলাই আন্দোলনে শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের নানা। এটাই এখন আমার বড় পরিচয় বলে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন সাক্ষী। তিনি বলেন, আনাস দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিল। সে লেখাপড়ায় খুব ভালো ছিল। তার আশা ছিল প্রকৌশলী হবে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের কাণ্ডে তার জীবন প্রদীপ নিভে যায়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে আমরা ঘুম থেকে জেগে আনাসকে বাড়িতে দেখতে পাই না। আমরা খোঁজাখুঁজি করি। তার মা তার পড়ার টেবিল থেকে একটি চিঠি উদ্ধার করে। চিঠিটি আনাসের হাতে লিখা। তখন সাক্ষী আবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। এই চিঠি পড়ে আমরা জানতে পারি যে সে আন্দোলনে গিয়েছে। আনাসের সাথে একটি ছোট সিম বিহীন বাটন মোবাইল ফোন ছিল। ওই মোবাইলে পরিবারের সদস্যদের কয়েকটি নাম্বার সেভ করা ছিল। বেলা আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিটের দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে আনাসের মায়ের ফোনে একটি কল আসে এবং জানতে চায় এই পরিবারের কেউ আন্দোলনে গিয়েছে কি না। তখন আনাসের মা বলে ‘আমার ছেলে আন্দোলনে গিয়েছে’। তখন অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজে আসেন। তখন আমি, আমার মেয়ে ও মেয়ের জামাই ওই হাসপাতালে যাই। তখন স্ট্রেচারে আনাসকে শায়িত এবং রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পাই। ওই হাসপাতালের ডাক্তাররা আনাসকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতাল থেকে বলা হয় লাশ নিয়ে যান।

পরবর্তীতে জানতে পারি যে আমার নাতি আনাস চাঁনখারপুলের নিকট নবাব কাটারায় গুলিবিদ্ধ হয়। আমি জানতে পারি আনাসসহ মোট ছয়জন গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। এই গুলি করে তৎকালীন সরকারের পুলিশ বাহিনী। এই জন্য আমি শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, এবং ওইখানে বসা পুলিশের সাবেক আইজিপি আবদুল্লাহ আল মামুনের ফাঁসি চাই। তখন আদালতের কাঠগড়ায় থাকা আবদুল্লাহ আল মামুন মাথা নিচু করে রাখেন।

উল্লেখ্য, এই মামলার তদন্ত চলছে এবং আদালতে আরো সাক্ষ্য উপস্থাপিত হবে বলে জানা গেছে।