অধ্যাদেশ নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে আজ বসছে সংসদ

গণভোটসহ কয়েক ইস্যুতে উত্তপ্ত হতে পারে মূলতবী অধিবেশন

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মূলতবি বৈঠক আজ রোববার বিকেলে বসছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনা ছাড়াও এ সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ঘিরে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের রাজনৈতিক বিতর্ক হতে পারে। বিশেষ করে গণভোট অধ্যাদেশসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আইন বাতিল (ল্যাপস) করার প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, যা সংসদ অধিবেশনকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আজ বেলা ৩টায় সংসদের বৈঠক বসবে। রাত ৮টার পর অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে। এর আগে গত ২৪ ও ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে বেশ কিছু অধ্যাদেশ নিয়ে প্রাথমিক মতামত গঠিত হলেও গণভোট, দুদক আইন, মানবাধিকার কমিশনসহ কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি। বিরোধী দলের সদস্যরা বলছেন, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাব করেছে সরকার দলীয় প্রতিনিধিরা। যদিও গত বৈঠকের পর তা অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব ইস্যু সংসদ ও কমিটির আলোচনায় বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ কমিটির আলোচনায় সরকার পক্ষ গণভোট অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন), গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, পুলিশ কমিশন, তথ্য অধিকার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংশোধনীসহ কয়েকটি অধ্যাদেশ ল্যাপস করার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে বিরোধী দল, বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী এসব প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের দাবি- গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাতিলের চেষ্টা ‘জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনার’ পরিপন্থী।

জানা যায়, বিশেষ কমিটির বৈঠকে যে কয়েকটি অধ্যাদেশ নিয়ে সরকার দলীয় প্রতিনিধিরা ল্যাপস্ করার পক্ষে নিজেদের মতামত উত্থাপন করেছেন তার মধ্যে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ অন্যতম। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ কার্যকর করার লক্ষে অধ্যাদেশটি জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকার দলীয় সংশ্লিরা বলছেন, আদেশের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির নেই। ফলে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ একটি সংবিধানবহির্ভূত দলিল এবং এটি কার্যকর করার লক্ষ্যে প্রণীত গণভোট অধ্যাদেশ,২০২৫ একটি প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যাদেশ।

ব্যাংক রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ অধ্যাদেশটি ল্যাপস করার যৌক্তিকতা প্রসঙ্গে সরকার বলছে, অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুর সাথে সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার মতো সংবেদনশীল বিষয় জড়িত। এমতাবস্থায় বিষয়টি নিয়ে অধিকতর কনসালটেশন প্রয়োজন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪ ও ২০২৫ অধ্যাদেশ ল্যাপস্ করার বিষয়ে সরকারদলীয় প্রতিনিধিরা মতামতে জানায় এটি ল্যাপস করে পরে অধিকতর সংশোধনসহ একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে।

সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রধান বিচারপতির সাবজেটিভ সার্টিসফিকেশনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। সরকার বলছে, অধ্যাদেশটি সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক তাই এটি সংসদে পাশ হওয়ার সুযোগ নাই। তবে, অধ্যাদেশটি সংসদের অ্যাক্ট. দ্বারা বাতিল করতে হবে এবং এই অধ্যাদেশের অধীনে ইতোমধ্যে সম্পাদিত বিচারক নিয়োগ প্রক্রিয়াকে হেফাজতের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ল্যাপস বা বাতিল করার বিষয়ে সরকার দলীয় প্রতিনিধিদের যুক্তি তদন্তপূর্ব অনুসন্ধান ছাড়াই এজহার দায়েরের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বিষয়টি সংবেদনশীল এবং সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত বিধায় অধিকতর সনসালটেশন মিটিংয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার (সংশোধনী) অধ্যাদেশ, ২০২৬ অধ্যাদেশটি ল্যাপস করে পরে অধিকতর সংশোধনসহ একটি আইন প্রণয়ন করার পক্ষে সরকার।

এ রকম আরো কয়েকটি অধ্যাদেশ ল্যাপস করার পক্ষে বৈঠকে মতামত উত্থাপন করা হয়েছে বলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে।

বিশেষ কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে প্রায় ১১৫টির বিষয়ে ঐকমত্য হলেও বাকি ১৮টি বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তার ভাষায়, গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে একমত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। একই সুরে দলটির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন অভিযোগ করেন, কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস করিয়ে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে, যা তারা মেনে নেবেন না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, অধ্যাদেশগুলো তিন ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে- কিছু অপরিবর্তিতভাবে পাস, কিছু সংশোধন করে নতুন বিল হিসেবে আনা এবং যেগুলোতে ঐকমত্য হবে না সেগুলো আপাতত ল্যাপস করা হবে। তিনি জানান, ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশে ইতোমধ্যে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, বেশ কিছু বিষয়ে ঐকমত্য এলেও প্রায় ২০টির মতো বিষয়ে আরো ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিনি জানান, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে কমিটি কাজ করছে এবং যেসব বিষয়ে মতভেদ থাকবে, সেগুলো শেষ পর্যন্ত সংসদেই সিদ্ধান্ত হবে।