শীতের সবজিতে স্বস্তি, ভোগ্যপণ্যের বাজারেও শঙ্কা নেই

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

শীতের শেষভাগে এসে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কাঁচাবাজারে শীতের সবজির দাম সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। ৩০ থেকে ৬০ টাকার মধ্যেই মিলছে বেশির ভাগ শীতকালীন সবজি। পাশাপাশি রমজান সামনে রেখে ছোলা, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি ও মজুদ পর্যাপ্ত থাকার পরও কোথাও মজুদ বাড়িয়ে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চোখে পড়ছে। তবে বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতার আশঙ্কা নেই বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

গতকাল রাজধানীর আজিমপুর, নিউমার্কেট, হাতিরপুল, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, ফুলকপি ও বাঁধাকপি প্রতিটি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শিমের কেজি ৩০ থেকে ৫০ টাকা আর কুমড়া, মুলা, পেঁপে, শালগম ও ব্রকলিসহ বেশ কয়েকটি শীতের সবজি ৬০ টাকার নিচেই পাওয়া যাচ্ছে।

নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের সবজি বিক্রেতা সাইমন রহমান বলেন, শীতের সবজির সরবরাহ ভালো থাকায় দাম অনেকটাই সহনীয়। তবে শসার দাম তুলনামূলক বেশি। খুচরা বাজারে প্রকারভেদে প্রতি কেজি শসা বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে। রোজা সামনে থাকায় শসার দাম খুব একটা কমার সম্ভাবনা নেই।

এ দিকে আলুর দাম আরো কিছুটা কমেছে। কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা কমে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকায়। আজিমপুর বাজারের ব্যবসায়ী শফিক উদ্দিন বলেন, নতুন আলুর সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমেছে। তবে এতে কৃষকরা ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

অন্য দিকে রমজান সামনে রেখে সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বাজারে প্যাকেটজাত সুগন্ধি চালের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কেজিতে ১৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল প্রায় ১৬০ টাকা।

ব্রয়লার মুরগির দাম গত দুই সপ্তাহ ধরে কিছুটা চড়া অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৮৫ টাকায়, যা জানুয়ারির শুরুতে ছিল ১৬৫ থেকে ১৭৫ টাকা। প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়।

হাতিরপুল বাজারে মুরগি কিনতে আসা গৃহিণী শামসুন নাহার বলেন, দীর্ঘদিন ১৬০ টাকা কেজিতে মুরগি পাওয়া গেছে। এখন রোজা সামনে রেখে হঠাৎ করেই দাম বাড়ানো হয়েছে। সিন্ডিকেট করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা হচ্ছে।

এ ছাড়া বাজারে মানভেদে আদা ও রসুন প্রতি কেজি ১৪০ থেকে ২২০ টাকা, চিনি ৯৮ থেকে ১০৫ টাকা, পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৭০ টাকা, ছোলা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, মসুর ডাল ৮০ থেকে ১২০ টাকা এবং গরুর গোশত ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চট্টগ্রামকেন্দ্রিক পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রমজানে চাহিদা বেশি থাকা ছোলা, মসুর ডাল, মটর, চিনি, ভোজ্যতেল ও খেজুরের মজুদ ও আমদানি স্বাভাবিক রয়েছে। ফলে রোজায় এসব পণ্যের দাম বড় ধরনের বাড়ার আশঙ্কা নেই।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে দুই লাখ তিন হাজার টনের বেশি, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭০ হাজার টন বেশি। মসুর ডাল আমদানি হয়েছে দুই লাখ ৫৪ হাজার টনের বেশি। এ ছাড়া মটর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন ও আদার আমদানিও স্বাভাবিক রয়েছে।

চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো: মহিউদ্দিন বলেন, ‘এবার রমজান সামনে রেখে প্রচুর এলসি খোলা হয়েছে। ছোলা, মসুর, মটর ও চিনির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। বন্দরে কিছুটা লাইটারেজ সঙ্কট থাকলেও বাজারে পণ্যের ঘাটতি নেই।’

চলতি অর্থবছরে চিনি ও ভোজ্যতেলের আমদানিও গত বছরের তুলনায় বেড়েছে। একই সাথে খেজুর আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকারি পর্যায়ে শুল্ক-কর কমানো হলেও সরবরাহ সঙ্কট না হলে রোজার আগে নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরবরাহ সঙ্কটের বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে চট্টগ্রাম বন্দরের জটিলতা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজে ৪৫ লাখ টনের বেশি ভোগ্যপণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, ভুট্টা, সয়াবিন, ছোলা, বিভিন্ন ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনি। লাইটার জাহাজ সঙ্কটের কারণে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে যেখানে সাত থেকে ১০ দিনে খালাস সম্ভব, সেখানে এখন সময় লাগছে ২০ থেকে ৩০ দিন।

ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানান, বন্দরে ছোলা, গম, মসুর ও মটর ডাল আটকে আছে। দ্রুত পণ্য খালাস করা গেলে বাজারে সরবরাহ বাড়বে এবং দাম কিছুটা হলেও কমতে পারে।

একই বাজারে আসা ক্রেতা রাশেদ বলেন, রমজানে যেসব পণ্যের বাড়তি চাহিদা থাকে, সেগুলোর দাম বাড়ানো ব্যবসায়ীদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর একই ঘটনা ঘটে। এবার ব্যতিক্রম হবে কি না সন্দেহ। চিনি ও ছোলার দাম আগেই বাড়তে শুরু করেছে। শেষ পর্যন্ত দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজান শুরুর প্রায় এক মাস আগেই বাজার চড়া হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে উঠে আসছে পাইকারি বাজার ও আমদানি পর্যায়ের সঙ্কট। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রামের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে ছোলার দাম কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে মানভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অ্যাংকর ডালের দাম দুই টাকা বেড়ে ৪৫ থেকে ৪৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সাথে প্রতি মণ চিনি ও পাম অয়েলের দাম ১০০ টাকা করে বেড়ে যথাক্রমে ৩ হাজার ৫০০ টাকা ও ৫ হাজার ৯৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আদা ও রসুনের দামও বাড়তির দিকে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে খুচরা বাজারে পড়ছে।

সরকারের বিপণন সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সাম্প্রতিক বাজারদরের প্রতিবেদনেও গত এক সপ্তাহে রাজধানীর খুচরাবাজারে সয়াবিন তেল, পাম অয়েল ও আদার দাম বাড়ার তথ্য উঠে এসেছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন রমজান সামনে রেখে নিত্যপণ্যের আমদানির জন্য আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ঋণপত্র খোলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে খোলা এলসির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সয়াবিন তেলের আমদানি ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৭ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুর ২৩১ শতাংশ বেশি। শুধু সেপ্টেম্বরে ৬ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার এবং অক্টোবরে ৫ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড জানিয়েছে, রমজান সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভোজ্য তেল, চিনি, ডালসহ প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের আমদানিতে শুল্ক ও কর যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা হয়েছে। তবে বাস্তবতায় এসব উদ্যোগের সুফল এখনো ভোক্তাদের কাছে পৌঁছায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দরের জটিলতা নিরসন, বাজারে কার্যকর মনিটরিং এবং মুনাফালোভীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফেরানো কঠিন হয়ে পড়বে। সাধারণ মানুষের আশঙ্কা, এবারও সংযমের মাস শুরু হওয়ার আগেই অসংযত বাজারের চাপে পড়তে হবে তাদের।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, রমজানের আগে মূল্যবৃদ্ধি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা নানা অজুহাতে দাম বাড়ালেও সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায় না। এই অবস্থা চলতে থাকলে রমজানে সাধারণ ভোক্তাদের বড় ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হবে।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, রমজান শুরু না হতেই দাম বাড়া প্রমাণ করে যে একটি শ্রেণী রমজানকে মুনাফার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। সরকার যখন বলছে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি হয়েছে, তখন বাজারে দাম বাড়ার যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের হলেও কার্যকর মনিটরিং চোখে পড়ছে না।