রাজশাহীর আমের স্বাদে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত

আমের রাজধানীতে কূটনৈতিক সফর

Printed Edition
back-3
রাজশাহীর বানেশ্বরহাটে আমের স্বাদ নিচ্ছেন মার্কিন রাষ্ট্রদুত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন : নয়া দিগন্ত

মুহা: আব্দুল আউয়াল, রাজশাহী ব্যুরো

বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত রাজশাহী। সুস্বাদু, রসালো ও সুগন্ধি আমের জন্য দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এ জেলার সুনাম রয়েছে। সেই রাজশাহীর আমের স্বাদ নিতে এবার সরাসরি হাজির হলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর আম হাট পরিদর্শন করেন তিনি। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ এই আমের বাজারে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন আড়ত, দোকান ও আমের সংগ্রহকেন্দ্র পরিদর্শন করেন রাষ্ট্রদূত। এ সময় তার সাথে ছিলেন মার্কিন দূতাবাসের পলিটিক্যাল কাউন্সেলর এরিক গিলিয়ান, পলিটিক্যাল অফিসার চার্লস বেসনার্ডসহ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

রাজশাহীর আম মৌসুম মানেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ী, পাইকার ও ক্রেতাদের সমাগম। আর এই মৌসুমে বানেশ্বর হাট হয়ে ওঠে আমের সবচেয়ে বড় বিপণনকেন্দ্রগুলোর একটি। শত শত ট্রাক, পিকআপ ও ভ্যানে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্তে পাঠানো হয় হাজার হাজার মণ আম। এই ব্যস্ত বাজারে এসে রাষ্ট্রদূত বিভিন্ন জাতের আম সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তিনি আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলেন এবং উৎপাদন, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ ও রফতানির নানা বিষয় সম্পর্কে অবগত হন। সফরের একপর্যায়ে তিনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কয়েকটি জনপ্রিয় জাতের আমের স্বাদও গ্রহণ করেন।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘রাষ্ট্রদূত হিসেবে রাজশাহীতে এটি আমার প্রথম সফর। এর আগে ২০২০ সালে একবার এসেছিলাম। তবে এবার বিশেষভাবে আমের মৌসুমে এসেছি, কারণ আমি রাজশাহীর আমের স্বাদ নিতে চেয়েছিলাম। এখানে আসতে পেরে আমি সত্যিই আনন্দিত।’ মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৃষিপ্রধান অঙ্গরাজ্য থেকে এসেছেন। ফলে কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজার ব্যবস্থার প্রতি তার আগ্রহ দীর্ঘদিনের।

রাষ্ট্রদূতের ভাষায়, ‘কোনো পণ্য যেখানে উৎপাদিত হয়, সেখানে গিয়ে সেটি দেখা ও স্বাদ নেয়ার অভিজ্ঞতার তুলনা নেই। সেখানে সবচেয়ে তাজা, বৈচিত্র্যময় ও সেরা পণ্য দেখার সুযোগ পাওয়া যায়।’

যুক্তরাষ্ট্রে তাজা আমের অভাব : বাংলাদেশী আমের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন বলেন, আমেরিকানদের কাছে আম অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি ফল। তবে যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত হিমায়িত আম বেশি পাওয়া যায়, যা বিভিন্ন পানীয় ও শেক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

তিনি বলেন, ‘আমেরিকানরা আম পছন্দ করে; কিন্তু রাজশাহীর মতো এত তাজা আম পাওয়া সেখানে কঠিন। এখানকার আমের স্বাদ ও সতেজতা সত্যিই অনন্য।’

রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য রাজশাহীর আমের আন্তর্জাতিক মান ও সম্ভাবনার প্রতি এক ধরনের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও কৃষকরা।

রফতানি বাড়াতে প্রয়োজন আধুনিক কোল্ড চেইন : বাংলাদেশ থেকে আম রফতানির সম্ভাবনা আরো বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামতও দেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি কোল্ড চেইন বা হিমাগারভিত্তিক সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, ‘সারা বছর আম সহজলভ্য রাখতে এবং হিমায়িত আম রফতানি বাড়াতে উন্নত কোল্ড চেইন ব্যবস্থা প্রয়োজন। এতে বাংলাদেশের আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও রফতানির সুযোগ আরো বৃদ্ধি পাবে।’

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেশের আম উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা ও আধুনিক সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়ে যায়। উন্নত কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং আন্তর্জাতিকমানের প্যাকেজিং ব্যবস্থা গড়ে উঠলে রাজশাহীর আম বৈদেশিক বাজারে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে রাজশাহীর আম : রাজশাহীর আম ইতোমধ্যে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। তবে উৎপাদনের তুলনায় রফতানির পরিমাণ এখনো সীমিত। ব্যবসায়ীদের মতে, বিদেশী কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের এমন সফর বিদেশী বাজারে রাজশাহীর আমের পরিচিতি বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

স্থানীয় আম ব্যবসায়ীরা বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সফর শুধু সৌজন্য সফর নয়; এটি রাজশাহীর আম শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারগুলোর একটির প্রতিনিধির আগ্রহ আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও আকৃষ্ট করতে পারে।

অন্যদিকে কৃষকদের আশা, রাজশাহীর আমের ব্র্যান্ডিং, রফতানি অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদার হলে এ অঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

বিশ্ববাজারে নিরাপদ, সুস্বাদু ও মানসম্মত ফল হিসেবে রাজশাহীর আমের যে সুনাম রয়েছে, তা আরো বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে এ ধরনের সফর নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে। রাজশাহীর বাগান থেকে বিশ্বের বাজারে এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এখন প্রয়োজন উন্নত সংরক্ষণ ব্যবস্থা, আধুনিক বিপণন কৌশল এবং রফতানিবান্ধব অবকাঠামো। আর সেই যাত্রাপথে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই সফর নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।