ক্রীড়াঙ্গনে শ্রদ্ধা-স্মৃতি-কৃতজ্ঞতায় খালেদা জিয়া
Printed Edition
জসিম উদ্দিন রানা
গতকালের সকালটি শুরু হয়েছিল গভীর শোক দিয়ে। ৩০ ডিসেম্বর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দেশের ক্রীড়াঙ্গনও হয়েছে শোকাহত। রাজনীতির চেনা ময়দানের বাইরেও বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে তার ছিল এক নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক। পর্দার আড়ালে থেকে তিনি কেবল পৃষ্ঠপোষকতাই করেননি, বরং বাংলাদেশের আধুনিক ক্রীড়া কাঠামোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। তার স্মৃতিময় জীবন ও অবদান মানুষের মনে চিরকাল জাগ্রত থাকবে। ক্রীড়াঙ্গন, রাজনীতি ও সাধারণ জনগণ সকলের হৃদয়ে তার সাহসিকতা, নেতৃত্ব ও মানবিক গুণাবলির প্রতি শ্রদ্ধা হবে চিরস্থায়ী।
দলীয় ও রাষ্ট্রীয় অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও খেলাধুলায় মনোযোগ ছিল খালেদা জিয়ার। বাংলাদেশের ফুটবলের দু’টি বিশেষ ঘটনার সময়ই খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি ১৯৯৫ সালে চার জাতির শিরোপা। মিয়ানমার থেকে দেশে ফেরার দিনই রাতে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে ফুটবলারদের ডেকে ছিলেন খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের প্রথম সাফ চ্যাম্পিয়নও তার প্রধানমন্ত্রীকালীন সময়ে।
এ নিয়ে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক কানন বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলাধুলাকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য আমি শারীরিক শিক্ষা বিভাগে যোগ দিয়েছিলাম। আমি যখন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী ছিলাম। ম্যাডাম আমার কাছ থেকে প্রায়ই নির্বাচনের খোঁজখবর নিতেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের সবাই পাঁচ কাঠা করে প্লট পেয়েছিলাম; যা বিরল সম্মান।’
বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক ট্রফি এসেছিল ১৯৯৫ সালে। মিয়ানমারে মরহুম মোনেম মুন্নার নেতৃত্বে চার জাতির শিরোপা জিতে ঢাকায় ফিরে রাতেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল। ২০০৩ সালে ঢাকায় সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর দলের সবাইকে সরকারি প্লট দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অধিনায়ক ছিলেন হাসান আল মামুন। তিনি প্লট বিষয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের সবাই পাঁচ কাঠা করে প্লট পেয়েছিলাম। এ রকম সম্মান আর পাইনি।’
সরকারের কিস্তি পরিশোধ করেই ফুটবলাররা জমির মালিক হয়েছিলেন। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য প্রত্যেকে চার লাখ টাকা করে উপহার পেয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। ফলে বাকি চার লাখ টাকা কিস্তিতে পরিশোধে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি ফুটবলারদের।
খালেদা জিয়ার খালাতো বোন বাংলাদেশের তারকা অ্যাথলেট ও কোচ শামীমা সাত্তার মিমো। আত্মীয় হলেও মিমো ক্রীড়াঙ্গনে প্রভাব খাটাননি। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার তিনি যখন পেয়েছেন, তখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল না। পারিবারিকভাবে খুব কাছ থেকে দেখেছেন খালেদা জিয়াকে। জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত মিমো বর্তমানে অসুস্থ। বোনের চিরবিদায়ে শোকাহত মিমো বলেন, অ্যাথলেটিক্সে প্রতিনিয়ত স্বর্ণ জেতায় পত্রিকায় শিরোনাম হতো ‘স্বর্ণময় মিমো’। আপা এতে গর্ব করে বলতেন, ‘আমাদের গর্ব স্বর্ণ মিমো’। খেলাধুলার উন্নয়নে সব সময় ছিলেন সচেষ্ট। দিনাজপুর বিকেএসপি তিনি উদ্বোধন করেছিলেন।
শোক প্রকাশ করেছেন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মুখ্য তারকারা। সাবেক বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ও জাতীয় দলের অধিনায়ক সাকিব আল হাসান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেছেন। আল্লাহ তায়ালা তার রূহের মাগফিরাত দান করুন। সবার কাছে তার জন্য দোয়া প্রার্থনা করছি।’
সাবেক ওপেনার তামিম ইকবাল শোক প্রকাশ করেছেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার মৃত্যুতে দেশ হারাল এক দৃঢ় নেতৃত্বের প্রতীককে। মহান আল্লাহ তার রূহের মাগফিরাত দান করুন ও জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন।’
জাতীয় ক্রিকেট দলের রুবেল হোসেন, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, মুমিনুল হক, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়াসহ আরো অনেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন। জামাল লিখেছেন, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। ১৯৪৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ২০২৫-এর ৩০ ডিসেম্বর। শান্তিতে ঘুমান।’
রুবেল লিখেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং তার সব গুনাহ মাফ করে কবরকে প্রশস্ত করে দেন।’ লিটন দাসও পরিবার ও প্রিয়জনদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। মিরাজ ও মুমিনুল হকও একইভাবে শোকবার্তা দিয়েছেন।
খালেদা জিয়া চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২৩ নভেম্বর তিনি ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তিনি নিউমোনিয়াতেও আক্রান্ত হন। ৭৯ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীরউত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকো একজন ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে সরাসরি রাজনীতির মাঠকে কর্মক্ষেত্র না করে ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। মা-বাবার ক্ষমতা না দেখিয়ে নিভৃতে নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে ক্রীড়া ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক অবদান রাখেন। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় মাত্র ৪৫ বছর বয়সেই তার জীবনাবসান হয়।
কোকো ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে থাকাকালীন সময়ে ক্রিকেট রাজনীতিমুক্তকরণ যেমন করেছেন, তেমনি বিরোধীদলীয় নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর সাথে কাজ করে বাংলাদেশে অনন্য নজির স্থাপন করেন। ডিওএইচএস ক্লাবের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে ক্রিকেট খেলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে নিজে সভাপতি না হয়ে বোর্ডের অধীনে ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে বদলে ফেলেছেন বয়সভিত্তিক ক্রিকেটকে। ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে অস্ট্রেলিয়ান কোচ, ট্রেনার, ফিজিও আনার ট্রেন্ড চালু করেন।
বিসিবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নয়নে অসামান্য সমর্থন দিয়েছেন। ক্রিকেট অবকাঠামোর উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন এবং সারা দেশে খেলাটির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন খালেদা জিয়া। তার দূরদর্শিতা ও উৎসাহে দেশের ক্রিকেটে সাফল্য ও অগ্রগতির পথ সুগম করেছে।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনসহ (বাফুফে) গতকাল বিপিএলের দু’টি ম্যাচ, বাফুফের আওতাধীন সব ম্যাচ এবং নানা ফেডারেশনের ম্যাচগুলো স্থগিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া শোক জানিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ), বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, সাইক্লিং ফেডারেশন, টেনিস, হ্যান্ডবল, অ্যাথলেটিক্স, হকি, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, বক্সিং, সুইমিং, দাবা, তায়কোয়ান্দো, উশু, বাস্কেটবল, আরচারি, টেবিল টেনিস ফেডারেশন, ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্ট কমিউনিটি (বিএসজেসি), বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি (বিএসপিএ), বাংলাদেশ স্পোর্টস জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন (বিএসজেএ), জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদরা অন্যান্য ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন শোক জানিয়েছে।