বাবুগঞ্জে অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সঙ্কট

বাড়ছে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু

Printed Edition

বাবুগঞ্জ (বরিশাল) সংবাদদাতা

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলায় সাপে কাটা রোগীর মৃত্যু সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এর কারণ হিসেবে জানা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম ও জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের অভাব তীব্র অভাব দেখা দেয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাপে কাটা রোগীদের সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে রোগীকে সহজেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব। কিন্তু পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিনের অভাবে সেটাও করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপাশা ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের ২৮ বছর বয়সী যুবক এইচ এম সায়েম সম্প্রতি বিষধর সাপের দংশনের শিকার হন। তাকে দ্রুত বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হলেও সেখানে অ্যান্টিভেনম না থাকায় কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠাতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে সায়েমের মৃত্যু হয়। একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটে গত ২ মে কেদারপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ ভুতেরদিয়া নতুনচর গ্রামে। ৬০ বছর বয়সী হানিফ শরীফ গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে সাপের দংশনের শিকার হন। পরিবারের সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নেয়ার উদ্যোগ নিলেও পথেই তিনি মারা যান।

চাঁদপাশা ইউনিয়নের বাসিন্দা মো: জুয়েল হোসেন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যান্টিভেনম না থাকায় আমার ভাইকে বরিশালে নিতে হয়েছিল। সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো তাকে বাঁচানো যেত। প্রায় ১৬৪ দশমিক ৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বাবুগঞ্জ উপজেলায় বসবাস করেন প্রায় এক লাখ ৫৪ হাজার মানুষ। এখানে ৫০ শয্যার একটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থাকলেও বাস্তবে ৩০ শয্যার সীমিত সেবা কার্যক্রম চালু রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাপে কাটা রোগীর জন্য জরুরি অ্যান্টিভেনম দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত এই স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে। চিকিৎসকরা জানান, সাপের দংশনের পর প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ না হলে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।

বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো: মনিরুল ইসলাম বলেন, আমার পূর্বসূরি এন্টিভেনমের চাহিদা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সরবরাহ পাওয়া যায়নি। দায়িত্ব নেয়ার পর আমি জেলা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদফতরে একাধিকবার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। তিনি জানান, দেশে গোখরা সাপসহ কয়েক ধরনের বিষধর সাপ রয়েছে, যাদের বিষ দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত করে এবং রোগী অল্প সময়ের মধ্যেই সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়ে।

শুধু সাপের দংশন নয়, জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন নিয়েও একই ধরনের সঙ্কট দেখা দিয়েছে বাবুগঞ্জ উপজেলায়। আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই ভ্যাকসিন না নিলে মৃত্যুঝুঁকি প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায়- এমন সতর্কবার্তা থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরেই জরুরি ওষুধ, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং জীবনরক্ষাকারী ইনজেকশনের ঘাটতি রয়েছে। ফলে রোগীদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের বরিশাল শহরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী বিলম্ব তৈরি করে। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, এই সঙ্কটের পেছনে শুধু সরবরাহ ঘাটতিই নয়, বরং ওষুধ সরবরাহ চেইন, বাজেট বরাদ্দ এবং চাহিদা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও দীর্ঘসূত্রতা এবং সমন্বয়হীনতা রয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে চাহিদা পাঠানো হলেও তা সময়মতো অনুমোদন ও সরবরাহ না হওয়ায় কার্যত একটি প্রশাসনিক ফাঁক তৈরি হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপে কাটা ও জলাতঙ্ক- দুই ক্ষেত্রেই উপজেলা পর্যায়ে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে মৃত্যুহার কমানো সম্ভব নয়। এটি কেবল চিকিৎসা সঙ্কট নয়, বরং ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত দুর্বলতারও প্রতিফলন।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা সিভিল সার্জন ডা: এস এম মনজুর-এ-এলাহী বলেন, জলাতঙ্কের অ্যান্টি-র‌্যাবিস ভ্যাকসিন বর্তমানে কেন্দ্রীয় পর্যায়েই সঙ্কট রয়েছে। একটি ওষুধ কোম্পানি সরবরাহ করলেও তারা চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছে না। তবে তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, সাপে দংশনের অ্যান্টিভেনম দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সরবরাহ করা হবে। সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাবুগঞ্জের এই চিত্র শুধু একটি উপজেলারই নয়; বরং দেশের উপজেলা পর্যায়ের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি এটি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নেয়া হলে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।