অপরাধীদের টার্গেট ছিনতাই চুরি ডাকাতি
অপরাধীদের টার্গেট ছিনতাই চুরি ডাকাতি
Printed Edition
রাত পোহালেই কাল সম্ভাব্য ঈদুল ফিতর। নাড়ির টানে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে এরই মধ্যে ঢাকা ছেড়েছেন প্রায় দুই কোটি মানুষ। ফলে রাজধানী ফাঁকা হয়ে গেছে। তবে দীর্ঘ ৯ দিনের ছুটি থাকায় এবার ফাঁকা ঢাকায় চুরি, ছিনতাই, ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হওয়ার শঙ্কা করছে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এবারের ঈদযাত্রায় বড় কোনো অঘটন না ঘটলেও ফাঁকা ঢাকায় কিছুটা শঙ্কা নিয়ে বাড়ি গেছেন মানুষ। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘কঠোর’ নিরাপত্তা বলয়ের কথাও বলা হয়েছে। গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) প্রধান ও র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালকসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণ নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া ডিএমপির সব ইউনিট থেকে নগরীর নিরাপত্তায় ১৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পুলিশের টহল, গোয়েন্দা নজরদারিসহ নি-িদ্র নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ দিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, এবারে ঈদ ঘিরে রাজধানীতে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো হুমকি নেই। তারপরও যদি কোনো ষড়যন্ত্রের হুমকি থাকে জনগণকে সাথে নিয়ে আমরা এর মোকাবেলা করব।
ঈদুল ফিতরের টানা ৯ দিনের সরকারি ছুটিতে রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে এ সময় মহানগরে অন্তত ১৫ হাজার পুলিশ তৎপর থাকবে। রাস্তায় তল্লাশিচৌকি বসানোর পাশাপাশি বিপণিবিতান ও আবাসিক এলাকায় টহল জোরদার করা হবে। পাশাপাশি থাকবে যৌথবাহিনীর টহলও।
নগরীর নিরাপত্তা প্রসঙ্গে গতকাল শনিবার বিকেলে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) এস এন মো: নজরুল ইসলাম বলেন, এবারের ঈদকে কেন্দ্র করে নগরীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকছে নতুনত্ব। নতুন নিয়োগ পাওয়া ‘অক্সিলিয়ারি ফোর্স’ (সহায়ক বাহিনী) মার্কেট বা বিপণিবিতানের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে। এ ছাড়া আর্থিক লেনদেনসংক্রন্ত ব্যাংক, এ টি এম, স্বর্ণের মার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বাড়তি নজর দেয়া হয়েছে। ঈদের সময় ঢাকার রাস্তায় মানুষের চলাচল কমে যাবে। তখন আবাসিক এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হবে। রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তল্লাশিচৌকি বসিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। এ ছাড়া ঈদের সময় রাজধানীতে দিনে-রাতে ৬০০টি পুলিশ দল টহল দেবে। এ ছাড়া প্রতিদিন মহানগরের ৭৫টি তল্লাশিচৌকি পরিচালনা করা হবে।
ডিএমপি সূত্র জানায়, ঈদ ঘিরে অনেক মানুষ ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছেন। এতে বাসাবাড়ি, ফ্ল্যাট ও অফিস ফাঁকা হয়ে যাবে। ফাঁকা ঢাকায় অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছে নগরবাসী। চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি এই ভয়ের অন্যতম কারণ। এসব বিষয় মাথায় রেখে ঈদের আগে ও পরে নিরাপত্তা পরিকল্পনা সাজিয়েছে ডিএমপি। নগরবাসীকে উদ্দেশ করে ডিএমপি কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাত আলী এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পুলিশ দায়িত্ব পালন করলেও ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিজ দায়িত্বে নিশ্চিত করতে হবে। আমরা আপনাদের সাথে আছি, আমাদের ব্যবস্থাপনাটা আমরা করব।
ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, আগের ঈদের ছুটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সোনার দোকান, এটিএম বুথ বা আর্থিক লেনদেন সংক্রন্ত অফিসগুলোতে চুরি-ডাকাতি বেশি হয়। নিরাপত্তাকর্মীকে বেঁধে রেখে আবার নিরাপত্তাকর্মীদের যোগসাজশে ডাকাতি হয়। তাই এবারের ঈদের নিরাপত্তায় আগের দিনগুলোর কথা চিন্তা করে আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অফিস বা দোকানগুলোতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।
জানা গেছে, ঈদে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ ঠেকাতে রাতের বেলায় বাড়ানো হয়েছে পুলিশি টহল। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বাস টার্মিনাল, লঞ্চ ও রেলস্টেশনে। পুরান ঢাকা ছাড়াও মহানগরের বিভিন্ন এলাকার সোনার মার্কেটে রয়েছে পুলিশের কড়া নজরদারি। বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে। ইতোমধ্যে ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন বিপণিবিতান, কাঁচাবাজার, আড়তের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ছিনতাইকারী, ডাকাত, অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যদের ধরতে পুলিশ ও র্যাবের বিশেষ টিম সক্রিয় রয়েছে।
রয়েছে চুরি-ছিনতাইয়ের শঙ্কাও : এবার ভিন্ন এক অবস্থায় দেশে ঈদ আয়োজন হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে সরকার। ঈদে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রেখে নির্বিঘেœ নাগরিকদের ঈদ উদযাপনের সুযোগ করে দেয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। তবে ঈদকে কেন্দ্র করে ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী, অজ্ঞানপার্টি, জাল টাকার কারবারি থেকে শুরু করে চোর, ডাকাত, সাইবার অপরাধীরা তৎপর রয়েছে। প্রকাশ্য বেশ কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আতঙ্কও বিরাজ করছে নগরবাসীর মধ্যে। পুলিশের পক্ষ থেকে ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হলেও থেমে থাকেনি ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য। এর পাশাপাশি ফাঁকা ঢাকায় চুরির আশঙ্কাও করছেন তাদের।
কোনো শঙ্কা বা ঝুঁকি নেই : র্যাব
নগরবাসীর নিরাপত্তায় বিষয়ে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিকুর রহমান বলেন, ঈদকে সামনে রেখে কোনো শঙ্কা বা ঝুঁকি নেই। তবে ৯ দিনের সরকারি ছুটি থাকায় চোর-ডাকাতদের তৎপরতা থাকলেও আবাসিক এলাকায় র্যাবের টহল রয়েছে। অন্যান্য সময়ের তুলনায় এবার দ্বিগুণ নিরাপত্তা জোরদার ও টহল দেয়া শুরু করেছে। এ ছাড়াও লঞ্চ, রেলওয়ে ও বাস টার্মিনালগুলোতে টহলের পাশাপাশি সাদা পোশাকে র্যাব গোয়েন্দারা কাজ করছে। বড়বড় শপিংমলগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আছে র্যাব। ঈদের নামাজের সময় ঢাকার জাতীয় ঈদ-গা, শোলাকিয়া ও দিনাজপুরের মতো বড় জমায়েতগুলোতেও র্যাব সদস্যরা পোশাকে ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি ডগস্কোয়াড ও বোম্বডিস্পোজাল টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স সার্বক্ষণিক নজদরদারিতে রয়েছে।
সর্বোচ্চ সতর্কতায় ডিবি : গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি প্রধান) রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, ঈদুল ফিতর উৎসবমুখর ও নিরাপদ পরিবেশে উদযাপনের লক্ষ্যে এবং বাসাবাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানের সার্বিক নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে ডিএমপি। রমজানে নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিবি যেভাবে তৎপর ছিল, তেমনই ঈদের সময়ও ডিবি নগরবাসীর পাশে থাকবে।
ঈদে নগরীর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে জানিয়ে ডিবি প্রধান বলেন, ঈদ উপলক্ষে রাজধানীতে পুলিশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ঢাকার ৫০টি থানা এলাকায় প্রতিদিন দুই পালায় ডিএমপির ৬৬৭টি টহল টিম দায়িত্ব পালন করছে। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত স্থানে ৭১টি পুলিশি চেকপোস্ট পরিচালিত হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি অক্সিলিয়ারি ফোর্সও নিরাপত্তায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। ইউনিফর্মড পুলিশের পাশাপাশি মহানগরীর নিরাপত্তায় ডিবির বিভিন্ন টিম মাঠে কাজ করছে। বিশেষ করে, বিপণিবিতান, বাস ও লঞ্চ টার্মিনাল, রেলস্টেশনসহ জনবহুল এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
অপরাধ প্রতিরোধ ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো নাশকতা বা অপরাধ যেন না ঘটে, সে জন্য ডিবির গোয়েন্দা নজরদারি আগের তুলনায় জোরদার করা হয়েছে। সাইবার টিম তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে অপপ্রচার রোধে কাজ করছে। ডিবির মাদকবিরোধী অভিযানে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মাদককারবারি ও অভ্যাসগত অপরাধীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা তৈরি ও সরবরাহ প্রতিরোধে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে এবং অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নগরবাসীকে নিরাপত্তা বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যদি মহল্লা, বাসা বা মার্কেটে কোনো সন্দেহজনক তৎপরতা লক্ষ করা যায়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ি, থানা বা ডিবিকে জানাতে হবে। জরুরি প্রয়োজনে ডিএমপি কন্ট্রোল রুম বা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এ যোগাযোগের অনুরোধ জানান তিনি।
ডিএমপির ১৪ নির্দেশনা : ঈদুল ফিতর উপলক্ষে বাসাবাড়ি, অফিস, বিপণিবিতানসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তায় নগরবাসীর জন্য ১৪টি নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি। এর মধ্যে বাসা কিংবা অফিসে সিসি ক্যামেরা লাগানোর পাশাপাশি অর্থসহ মূল্যবানসামগ্রী ও দলিলদস্তাবেজ নিরাপদ স্থানে বা নিকট আত্মীয়ের হেফাজতে রাখা অথবা প্রয়োজনে ব্যাংক লকারের সহায়তা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এবার পুলিশকে সহায়তা করার জন্য ‘অক্সিলারি ফোর্স’ নিয়োগ করা হয়েছে। এই ‘অক্সিলারি ফোর্স’ এবার ঈদে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে। পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়ে জনসাধারণকে সচেতন থাকার বিষয়ে বিশেষ অনুরোধ জানান ডিএমপি।