সপ্তাহের শুরুতে ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা
লোকসানি কোম্পানির শেয়ারদর ৬০০ টাকার ওপরে
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
বিগত সপ্তাহজুড়ে দাপটে থাকা ব্যাংকিং খাত সপ্তাহের শুরুতেই বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের পুঁজিবাজারে এ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানিই দরপতনের শিকার হয়। ফলে দরপতন দিয়েই গতকাল লেনদেন শুরু হয় পুঁজিবাজারে। আর স্বাভাবিকভাবেই পুঁজিবাজারের প্রধান এ খাতটির দরপতনের প্রভাব পড়েছে অন্য খাতেও। ফলে দেশের দুই পুঁজিবাজারেই গতকাল সূচকের কমবেশি অবনতি ঘটে। তবে ভালো দিক ছিল, এর মধ্যেও বাজারগুলো লেনদেনের একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানি গত অর্থবছরে ভালো করলেও বাকিগুলো বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকসহ এ খাতের ১০টির বেশি কোম্পানি লভ্যাংশ দিতে পারেনি। তাদের মতে, ব্যাংক খাতে ডিভিডেন্ড না দেয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে শ্রেণিকৃত ঋণ ও বিনিয়োগের বিপরীতে বড় ধরনের প্রভিশন ঘাটতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি থাকে তারা ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারে না। আবার নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণে বেশ কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ সুবিধা নিয়েছে, যার ফলে আর্থিক দায় কিছুটা স্থগিত থাকলেও তারা মুনাফা বণ্টন করতে পারছে না। এ কারণে এসব কোম্পানির ক্যাটাগরি পরিবর্তন হবে। তা ছাড়া বিগত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদনের পাশাপাশি নতুন অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ খাতের দুর্বল কোম্পানিগুলোর আসল চেহারা বিনিয়োগকারীদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে এ খাতটি বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয়।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২১ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ২৮৬ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২৬৫ দশমিক ৩৯ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ সূচকটি ১ দশমিক ৮৮ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকটি ২ দশমিক ৪৫ পয়েন্ট হারায়। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৪ দশমিক ২২ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স যথাক্রমে ৮ দশমিক ১৪ ও ৪ দশমিক ১৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়।
এ দিকে সরকার পরিবর্তনের পর পুঁজিবাজারগুলো স্বাভাবিক আচরণে ফেরার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ঘটছে না। বিনিয়োগকারীদের একটি ক্ষুদ্র অংশ নিজেদের সক্ষমতা ব্যবহার করে বাজারের স্বাভাবিকত্ব নষ্ট করে দিচ্ছে। তার উদাহরণ বেশ কয়েকটি দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানির সাম্প্রতিক আচরণ। এদের একটি জিকিউ বলপেন। দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা কোম্পানিটির শেয়ার দর এখন ৬০০ টাকার উপরে। গতকাল ৬২৬ দশমিক ২০ টাকায় লেনদেন শেষ করে কোম্পানিটি। এ দিন ডিএসই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কোম্পানির তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উল্লিখিত সময়ে কোম্পানি ৪৭ পয়সা লোকসান দিয়েছে। আগের বছর একই সময়ে কোম্পানিটির লোকসানের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৭৩ টাকা। প্রতিবেদন প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর কমার কথা থাকলেও বৃদ্ধি পেয়েছে আরো ৯ টাকা।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির উৎপাদিত পণ্য ছিল একটি বলপেন। কোম্পানিটি তখন ভালো বাজার পেয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন বাজারে কোম্পানিটির পণ্য চোখে পড়ে না। কোম্পানির মোট শেয়ারসংখ্যা ৮৯ লাখ ২৮ হাজার ৯১টি, যার ৩৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ উদ্যোক্তাদের হাতে, ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর হাতে, দশমিক ০৫ শতাংশ বিদেশীদের হাতে এবং ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ২০১৯ সালের পর কোম্পানিটি ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে পারেনি। কখনো ৫ শতাংশ, কখনো ২.৫০ শতাংশ ও কখনো ৩ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। ২০২৪ সালে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ দেয় কোম্পানিটি। কিন্তু ডিএসইর ওয়েবসাইট ঘেঁটে কোম্পানিটির মূল্য-আয় অনুপাত পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসেও কোম্পানিটির শেয়ার দর ছিল ১৫০ টাকার আশপাশে। কিন্তু গত ৯ মাসেরও কম সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে ৪০০ শতাংশের বেশি। সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারের সর্বোচ্চ দর উঠেছিল ৬৩৯ দশমিক ৯০ টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এ ধরনের কয়েকটি কোম্পানির কারণে বাজারে বিনিয়োগকারীরা আসতে উৎসাহ পায় না। কারণ যে বাজারে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে থাকা কোম্পানির শেয়ারের দর এ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক পুঁজিবাজার বলা যায় না। এ ধরনের আরো কয়েকটি কোম্পানি রয়েছে যেগুলোর একইভাবে বিনিয়োগকারীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ সীমাহীন কারসাজির মাধ্যমে মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়ে চলেছে। তারা বলেন, বছরের পর বছর ধরে বাজারে এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনা চলতে থাকলেও বিএসইসি বা স্টক এক্সচেঞ্জগুলো এর বিরূদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করছে না। তাই বর্তমান অর্থমন্ত্রীর ভাষায় অনেকে পুঁজিবাজারকে জুয়ার ‘ক্যাসিনো’ বলতেও দ্বিধা করছে না।
সূচকের অবনতির ফলে গতকাল পুঁজিাবাজরগুলোতে লেনদেন কিছুটা হ্রাস পায়। ঢাকা শেয়ারবাজার মোট ৮২৯ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৩৫ কোটি টাকা কম। গত বৃহস্পতিবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮৬৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার এ দিন ৪১ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। বৃহস্পতিবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৪৮ কোটি টাকা।