রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনা নিয়ে ‘স্টার নির্বাচনী সংলাপ’

সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে কল্যাণকর

Printed Edition
back-3
রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে স্টার নির্বাচনী সংলাপে বিভিন্ন দলের নেতারা : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবনা ও নাগরিকদের প্রত্যাশা জানার লক্ষ্যে আয়োজিত ‘স্টার নির্বাচনী সংলাপ’ এ বলা হয়েছে- সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে এগিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে কল্যাণকর। এই সংলাপের আয়োজন করেছে দ্য ডেইলি স্টার। গতকাল মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই সংলাপ শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।

অনুষ্ঠানের শুরুতে দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ আয়োজনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন। ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামের পক্ষে যুগ্ম সম্পাদক আশা মেহরীন আমিন স্বাগত বক্তব্য দেন।

গত কয়েক দিনের ঘটনায় মানুষ ভাবছে, নির্বাচন আদৌ হবে কি : মির্জা ফখরুল

সংলাপে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনায় দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। তারা নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে, নির্বাচন আদৌ হবে কি না।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের আন্দোলন, ত্যাগ, রক্তপাত, নির্যাতন এবং সর্বশেষ ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই সুযোগও যেন হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের মানুষ সবসময় নির্বাচনপ্রিয়। কিন্তু গত ১৫ বছরে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে যে, নির্বাচন এড়িয়ে চলাই যেন মানুষের বাঁচার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার যে সুযোগ এসেছে, সেটিও এখন ঝুঁকির মুখে। তিনি বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনের ওপর জোর দিয়ে আসছে। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে নানা সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু সময়ক্ষেপণের কারণেই নির্বাচন বানচালের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, এটা এখন প্রমাণিত।

বিএনপি মহাসচিব বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকেই তারা আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে খালেদা জিয়ার ঘোষিত ‘ভিশন-২০৩০’-তে রাজনৈতিক কাঠামো সংস্কারের যে বিষয়গুলো ছিল, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের সাথে তার অনেক মিল রয়েছে। তিনি জানান, অর্থনীতি নিয়ে বিএনপি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নীতিপত্র প্রস্তুত করেছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধাপে ধাপে পাঁচ বছরের মধ্যে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় নেয়া সম্ভব।

ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে চায় জামায়াত : হামিদুর রহমান আযাদ

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, তার দল একটি ইনসাফের বাংলাদেশ, মানবিক সমাজ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি গড়তে চায়। তিনি বলেন, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়াই তাদের মূল লক্ষ্য। দুর্বৃত্তায়ন, সন্ত্রাস ও অনিয়ম দূর করে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হবে-যাতে নাগরিকরা নিরাপত্তার অনুভূতি পান।

শিক্ষাখাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামায়াত অবৈতনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। বর্তমানে শিক্ষায় জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে ৬ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকেও অবৈতনিক করার কথা জানান তিনি।

তিনি বলেন, মেধাপাচার রোধে দেশের ভেতরে সুযোগ বাড়াতে হবে। অর্থনীতিতে দুর্নীতিই প্রধান বাধা উল্লেখ করে তিনি বলেন, রফতানিখাতের বৈচিত্র্য আনতে পারলে এবং কর দুর্নীতি দূর করতে পারলে টেকসই অগ্রগতি সম্ভব। বাণিজ্যবান্ধব অর্থনীতি গড়তে তিন বছর অন্তর কর-রিলিফ ও বিনিয়োগ প্রণোদনার কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি নারী শিক্ষা ও অধিকার, কৃষক-মৎস্যজীবীদের সহায়তা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং বেকারত্ব শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা না নিলে ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাবের আশঙ্কা

স্টার নির্বাচনী সংলাপে সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, নির্বাচন বিলম্বিত বা ভণ্ডুল করার সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক অপচেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, উদীচী ও ছায়ানটের ওপর সাম্প্রতিক হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

তিনি সতর্ক করে বলেন, সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলে অনির্বাচিত ও সুবিধাভোগী শক্তিগুলো নতুন রূপে আবার ক্ষমতায় ফেরার চেষ্টা করবে। সেলিম বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের শিক্ষা নিতে না পারলে আবার ফ্যাসিবাদের পুনরাবির্ভাব ঘটবে।’ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু নির্বাচনেই সব সমস্যার সমাধান হবে, এমন ধারণা বিভ্রান্তিকর। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে তিনি ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা’ অবস্থার সাথে তুলনা করেন। জনগণের ক্ষমতায়ন, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং অর্থের প্রভাবমুক্ত নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

জনগণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে চায় : নাহিদ

‘স্টার নির্বাচনী সংলাপ’ অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আগামী দিনের বাংলাদেশে জনগণ রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও বাস্তবায়ন দেখতে চায়। তিনি বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট থেকেই এনসিপি আত্মপ্রকাশ করেছে এবং আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নই দলের প্রধান লক্ষ্য।

নাহিদ গণ-অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য হিসেবে তিনটি জোর দেন- ১. গণতান্ত্রিক বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা, ২. বৈষম্যহীন ন্যায্য সমাজ গঠন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে এবং ৩. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণœ রাখা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস প্রতিশ্রুতি ভাঙার ইতিহাস। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়নি। আমাদের লক্ষ্য হলো ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করা এবং জনগণকে দেখানো যে আমরা প্রতিশ্রুতি রাখব।’

সরকার-সুশাসন ও দুর্নীতি বিষয়ে নাহিদ বলেন, ‘দুর্নীতি দমন করতে হলে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দুদক নয়, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সব প্রকল্পের হিসাব- দেনা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার গুরুত্বও উল্লেখ করেন। সামাজিক ফ্যাসিবাদের উত্থান প্রতিরোধে নতুন নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকার উপর জোর দেন। সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টারের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে সংবাদমাধ্যম পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান নাহিদ।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ

স্বাগত বক্তব্যে আশা মেহরীন আমিন বলেন, দ্য ডেইলি স্টার একটি সৎ, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ সরকারের পক্ষে বিশ্বাসী- যে সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখবে। তিনি বলেন, এটি কেবল একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্ভব। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পর একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার বড় সুযোগ এসেছিল। তখন এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ ছিল, যা ক্ষমতার নয়, জনগণের সেবা করবে। কিন্তু সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।

আশা মেহরীন আমিন বলেন, এখন আবার একটি নতুন বাংলাদেশের সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনই একমাত্র পথ। এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, এই সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণকে জানাবে, ক্ষমতায় গেলে কিংবা বিরোধী দলে থাকলে তারা কী ভূমিকা পালন করবে।

ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করে একটি শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক, নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ও সিপিডি ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, অধ্যাপক নাভিন মুর্শিদ, নাগরিক অধিকারকর্মী মিজানুর রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রতিনিধিরা।