ফুলপুর আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতি জলাবদ্ধতায় বাসিন্দাদের ভোগান্তি

Printed Edition

ফুলপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা

ভূমিহীন ও গৃহহীন দরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতে নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প এখন অনেক জায়গায় যেন নতুন ভোগান্তির নাম। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিম্নমানের নির্মাণ, জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট, অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন, যাতায়াতের রাস্তার অভাব এবং দীর্ঘদিন ঘর ফাঁকা পড়ে থাকার অভিযোগ উঠেছে। ছনধরা ইউনিয়নের হাটপাগলা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকেল্পের আটটি ঘরের মধ্যে সাতটিই খালি পড়ে আছে। আবার কোথাও বর্ষায় হাঁটুপানি পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে হয় বাসিন্দাদের।

সরেজমিনে উপজেলার পাঁচটি আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ৭৪ পরিবারের জন্য বরাদ্দ ৭৪টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১৯টিতে কেউ বসবাস করেন না। অনেকেই ঘর পেয়েও চলে গেছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও অপরিকল্পিত স্থান নির্বাচন করায় এসব ঘর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

হাটপাগলা গ্রামের আশ্রয়ণ প্রকল্পে আট পরিবারের জন্য নির্মিত আটটি ঘরের মধ্যে সাতটিই খালি পড়ে আছে। মাত্র একটি পরিবার সেখানে বসবাস করছে। স্থানীয়রা জানান, শুরুতে সব ঘরেই মানুষ ছিল। পরে নানা দুর্ভোগ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধিকাংশ পরিবার ঘর ছেড়ে চলে যায়। খালি ঘরগুলোতে মাঝে মাঝে বহিরাগতদের জুয়ার আড্ডাসহ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে।

সিংহেশ্বর ইউনিয়নের মোকামিয়া গ্রামের আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ১০ পরিবারের মধ্যে বর্তমানে আটটি পরিবার বসবাস করছে। প্রকল্পের জমি পাশের ফসলি জমির সমান উচ্চতা হওয়ায় বর্ষায় আঙিনা ও বারান্দা পানিতে তলিয়ে যায়। একটিমাত্র নলকূপে সব পরিবারের চাহিদা মেটানোও সম্ভব হয় না।

বাসিন্দা জোছনা বেগম বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই ঘরের ছাদ থেকে ভেতর পানি পড়ে। বের হওয়ার রাস্তা না থাকায় জমির আইল ধরে চলতে হয়।’

ফুলপুর সদর ইউনিয়নের নগুয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৩৬টি ঘরের মধ্যে পাঁচটিই ফাঁকা পড়ে আছে। এখানে পয়ঃনিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা আরো করুণ। দেখা যায় বাথরুম ও টয়লেটে পানি জমে আছে। বর্ষাকালে পুরো আঙিনা হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায়। বাসিন্দা জেসমিন বলেন, ‘পানি জমে থাকায় টয়লেট ব্যবহার করা যায় না।’

রূপসী ইউনিয়নের রূপসী গ্রামের প্রকল্পে একটি মাত্র নলকূপ থাকলেও সেটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো হয়ে আছে। ফলে বাসিন্দাদের দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়। বালিয়া ইউনিয়নের সলংগা গ্রামের ১৫টি পরিবারের জন্য নির্মিত প্রকল্পের পাঁচটি ঘরের কাউকে পাওয়া যায়নি। সেখানে প্রধান সড়ক থেকে প্রকল্পের দূরত্ব ২০০ গজ হলেও চলাচলের জন্য উপযুক্ত রাস্তা নেই। বাসিন্দাদের অন্যের বাড়ির ভেতর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রায়ই হেনস্তার শিকার হতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ঠিকাদারির অনিয়ম, নিম্নমানের টিন, কাঠ ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং ভিটা উঁচু না করায় এসব সমস্যা তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্তও হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ঘর নির্মাণে অনিয়ম ও গাফিলতির দায়ে সাবেক ইউএনওর বেতন গ্রেড অবনমন করা হয়। কুলাউড়া ও মাদারীপুরেও দুদক আশ্রয়ণ প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালায়।

ফুলপুরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এখানেও প্রকল্প গ্রহণের সময় মানের চেয়ে বরাদ্দ ও কাগজপত্রে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে; ফলে প্রকৃত সুবিধাভোগীরা আজও দুর্ভোগে কষ্ট পাচ্ছেন।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া ইসলাম সীমা বলেন, ছনধরা ইউনিয়নের আশ্রয়ণ প্রকল্পের সাতটি ঘর খালি থাকার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। দ্রুত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। অন্যান্য আশ্রয়ণ কেন্দ্রের অব্যবস্থাপনাও খতিয়ে দেখা হবে।