বে-টার্মিনালে বৈদেশিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা
২০ বছরে কার্গো চাহিদা বাড়বে তিনগুণ, সক্ষমতা কতটুকু?
Printed Edition
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো এর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, যা প্রায় সম্পূর্ণরূপেই সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তবে দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রফতানি চাহিদার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা অর্জন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বিশেষ করে, চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ‘বে-টার্মিনাল’-এ এখন পর্যন্ত কাক্সিক্ষত বৈদেশিক বিনিয়োগের চূড়ান্ত নিশ্চয়তা না মেলায় অংশীজনদের মধ্যে গভীর সংশয় দানা বাঁধছে।
বন্দরসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সূত্রগুলো বলছে, আগামী ২০ বছরে দেশে আমদানি ও রফতানি কার্গোর চাহিদা বর্তমানের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পাবে। এই বিশাল লজিস্টিকস চাপ সামলানোর জন্য দেশের বন্দর অবকাঠামোর যে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন, তার গতি এবং অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৪৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে কনটেইনার পরিবহন প্রায় এক কোটি ১০ লাখ (১১ মিলিয়ন) টিইইউস (টোয়েন্টি-ফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিটস) এবং সার্বিক কার্গো হ্যান্ডলিং ৩৭ কোটি মেট্রিক টনে পৌঁছাবে। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের বর্তমান প্রস্তুতি কতটুকু, তা নিয়ে বন্দর ও মেরিটাইম বিশেষজ্ঞদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার প্রাক্কলন ও বন্দরের লক্ষ্যমাত্রা
একাধিক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লজিস্টিকস ও মেরিটাইম গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের বন্দরগুলোকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ: ৪৭ লাখ টিইইউএস কনটেইনার; ২০৩৫ সাল নাগাদ: ৬৬ লাখ টিইইউএস কনটেইনার; ২০৪০ সাল নাগাদ: ৮৭ লাখ টিইইউএস কনটেইনার; ২০৪৫ সাল নাগাদ: এক কোটি ৯ লাখ টিইইউএস কনটেইনার।
এই এক কোটি ৯ লাখ টিইইউএস কনটেইনারের মধ্যে একক বন্দরভিত্তিক ভাগ করলে দেখা যায়, ২০৪৫ সাল নাগাদ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে একাই সামলাতে হবে সাড়ে ৭৫ লাখ টিইইউএস। এ ছাড়া মোংলা বন্দরকে তিন লাখ টিইইউএস, গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ীকে ২৯ লাখ টিইইউএস এবং পায়রা বন্দরকে দুই লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেল করার লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। তবে পলিপ্রবণ এলাকা হওয়ায় এবং তীব্র নাব্যতা সঙ্কটের কারণে পায়রা বন্দরের পক্ষে এই কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বন্দর বিশেষজ্ঞরা শুরু থেকেই তীব্র দ্বিমত পোষণ করে আসছেন।
একইভাবে, নন-কনটেইনারাইজড কার্গো (যার মধ্যে শুষ্ক ও তরল বা ড্রাই অ্যান্ড লিকুইড বাল্ক অন্তর্ভুক্ত) হ্যান্ডলিংয়ের চাহিদাও জ্যামিতিক হারে বাড়বে। জরিপ অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ: ১৮ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন; ২০৩৫ সাল নাগাদ: ২৪ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন; ২০৪০ সাল নাগাদ: ৩০ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন; ২০৪৫ সাল নাগাদ: ৩৬ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন চাহিদা দেখা দেবে। ২০৪৫ সালের এই ৩৬ কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন কার্গোচাহিদার বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দরকে ২৫ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন, মোংলা বন্দরকে দুই কোটি ৮০ লাখ মেট্রিক টন, পায়রা বন্দরকে এক কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন এবং মাতারবাড়ী বন্দরকে ৭০ কোটি ৩০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বন্দরসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দ্রুত ক্রমবর্ধমান এই অর্থনৈতিক চাহিদা ও চাপের বিপরীতে প্রতিটি পোর্টকে তাদের ভৌগোলিক ও নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে এখনই মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী প্রস্তুত না করলে দেশের সামগ্রিক সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।
৪ বন্দরের সক্ষমতা, সম্ভাবনা ও চলমান সঙ্কট
১. চট্টগ্রাম বন্দর: সক্ষমতার কানায় কানায়, বে-টার্মিনাল নিয়ে জটিলতা: দেশের মোট কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের ৮৯ শতাংশ এবং মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশই এককভাবে পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। তবে এই ঐতিহ্যবাহী বন্দরের কিছু প্রাকৃতিক ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কর্ণফুলী নদীর ওপর অবস্থিত হওয়ায় এই বন্দর চ্যানেলে প্রবেশের জন্য জাহাজের সর্বোচ্চ ড্রাফট (পানির নিচের অংশ) ১০ মিটার এবং সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ২০০ মিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর ৩৫ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ টিইইউস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮০ লাখ ৭২ হাজার ৮২৬ মেট্রিক টন কার্গো এবং চার হাজার ৩৩৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে, যা এর আগের সব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) মিলিয়ে বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৩৫ লাখ টিইইউএস। এর সাথে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) পরিচালিত পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের (পিসিটি) পাঁচ লাখ টিইইউএস যোগ করলে মোট সক্ষমতা দাঁড়ায় ৪০ লাখ টিইইউএস। ডেনিশ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালসের সাথে কনসেশন চুক্তির আওতায় নির্মাণাধীন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল (এলসিটি) চালু হলে আরো ৯ লাখ টিইইউএস সক্ষমতা যোগ হবে।
তবে মূল সঙ্কট তৈরি হয়েছে সমুদ্র উপকূলবর্তী স্বপ্নের ‘বে-টার্মিনাল’ প্রকল্প নিয়ে। সিঙ্গাপুরের পিএসএ এবং দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় দু’টি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের কথা থাকলেও তা এখনো আমলাতান্ত্রিক ও কৌশলগত অনিশ্চয়তায় আটকে আছে। বছরের পর বছর ধরে বে-টার্মিনালে শতকোটি ডলারের বৈদেশিক বিনিয়োগের কথা বলা হলেও, বাস্তবে এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান তহবিল আসেনি। কেবল সমুদ্রের ঢেউ থেকে টার্মিনালকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘ব্রেকওয়াটার’ বা ঢেউপ্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি ঋণ বরাদ্দ অনুমোদিত হয়েছে।
সূত্র মতে, পিএসএ সিঙ্গাপুর সাফ জানিয়ে দিয়েছে, চ্যানেলে ন্যূনতম ১২ মিটার গভীরতা নিশ্চিত করা এবং ব্রেকওয়াটার সম্পূর্ণ নির্মিত হওয়ার পরই তারা মূল টার্মিনাল অবকাঠামোতে চূড়ান্ত বিনিয়োগ করবে। অন্য দিকে, এনসিটির পরিচালনা ও বিনিয়োগ নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি দরকষাকষি এখনো ঝুলে থাকায় তারাও বে-টার্মিনালে সহসা অর্থায়ন করছে না। ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দেয়া পূর্বাভাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের চাপ বাড়তে থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর এখন সক্ষমতার একেবারে শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। ২. মোংলা বন্দর : পদ্মা সেতুর পরও অপূর্ণ সম্ভাবনা: দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা, যা বঙ্গোপসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার উজানে পশুর নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত। এই বন্দরের প্রধান সমস্যা এর দীর্ঘ চ্যানেল এবং সীমিত নাব্যতা। বন্দরের প্রবেশপথের সর্বনি¤œ গভীরতা মাত্র ৬.১ মিটার এবং চ্যানেলটি প্রায় ৭০ নটিক্যাল মাইল দীর্ঘ। ফলে কেবল ১.৫ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে সর্বোচ্চ ২২৫ মিটার দৈর্ঘ্য এবং আট থেকে সাড়ে আট মিটার ড্রাফটের জাহাজ এই বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে।
২০২২ সালের জুন মাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবেশদ্বার পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর আশা করা হয়েছিল মোংলা বন্দরের ব্যবহার রাতারাতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেশের তৈরী পোশাক বা প্রধান আমদানিকারকদের এই বন্দর ব্যবহারে তেমন আগ্রহ দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোংলা বন্দরের বার্থ অকোপেন্সি রেশিও (জেটি ব্যবহারের হার) মাত্র ৮ শতাংশ, যা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এর মূল কারণ, মোংলা জেটি থেকে ওয়ান-ওয়ে নদীপথে যাতায়াতে জাহাজগুলোর প্রায় ১০ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় লাগে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক কনটেইনার মাদার ভেসেলগুলো সরাসরি মোংলায় না এসে প্রথমে চট্টগ্রামে পণ্য খালাস করে, যার পর ছোট ফিডার জাহাজ মোংলায় আসে। বর্তমানে ভারতীয় ঋণের (এলওসি) আওতায় মোংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ প্রকল্পটি ভূ-রাজনৈতিক ও দ্বিপক্ষীয় জটিলতায় সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। তবে চীনের সাথে জিটুজি (সরকার টু সরকার) চুক্তির আওতায় চার হাজার ৬৮ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে দু’টি কনটেইনার জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড, বিপজ্জনক কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড এবং আধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন সংগ্রহের কাজ ঢিমেতালে চলছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দরে ১০৪.১২ লাখ মেট্রিক টন কার্গো এবং মাত্র একুশ হাজার ৪৫৬ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে, যা এর প্রকৃত সক্ষমতার এক-দশমাংশও নয়।
৩. পায়রা বন্দর: ‘রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ’ ও বিপুল লোকসানের শঙ্কা: পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরটি একটি অত্যন্ত জটিল ও তীব্র পলিপ্রবণ (সিল্টেশন) এলাকায় অবস্থিত। ২০১৩ সালে কোনো প্রকার গভীর অর্থনৈতিক বা টেকনিক্যাল ফিজিবিলিটি স্টাডি (আর্থ-কারিগরি সমীক্ষা) ছাড়াই কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে এই বন্দরের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৬ সালে ব্রিটিশ হাইড্রোলিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘এইচআর ওয়েলিংফোর্ড’ একটি বিস্তারিত সমীক্ষা চালিয়ে জানায়, এই বন্দরে ড্রেজিং (নদী খনন) খাতের নিয়মিত ব্যয় এবং বন্দরের সামগ্রিক আয়ের অনুপাত হবে ৩:১। অর্থাৎ প্রতি এক টাকা আয়ের বিপরীতে তিন টাকা শুধু নদী পরিষ্কার করতেই খরচ হবে।
পরবর্তীতে জার্মান প্রতিষ্ঠান ‘রয়েল হাসকোনিং’-এর মাস্টারপ্ল্যানেও স্পষ্টভাবে বলা হয়, অত্যধিক পলি জমা এবং পশ্চাৎভূমির (হিন্টারল্যান্ড) অনগ্রসর গ্রামীণ অর্থনীতি এই বন্দরটিকে লাভজনক করার প্রধান অন্তরায়। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সরকারের আমলে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রাবনাবাদ চ্যানেলে ক্যাপিটাল ড্রেজিং করা হয়, যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছিল। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ড্রেজিং করার পর চ্যানেলটিতে আগের চেয়েও দ্রুতগতিতে পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে।
পায়রা বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এই বন্দরটি কেবল দু’টি কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিএল ও বিসিপিসিএল) কয়লা খালাসের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে, যা থেকে বছরে সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা আয় সম্ভব। কিন্তু এই চ্যানেলটি সচল রাখতে প্রতি বছর মেইনটেইন্যান্স ড্রেজিং বা রক্ষণাবেক্ষণ খননেই খরচ হবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে এখানে মাত্র সাড়ে ছয় মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে, যা একটি বড় আকারের খালি মাদার ভেসেলের ড্রাফটের সমান। ফলে এটিকে কনটেইনার পোর্ট হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অর্থনৈতিকভাবে আত্মঘাতী বলে মনে করছেন মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা। এতসব নেতিবাচক রিপোর্টের পরও নতুন করে আরো এক হাজার কোটি টাকার ড্রেজিং প্রকল্প হাতে নেয়ার তোড়জোড় চলছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় এবং পায়রা বন্দরকে একটি ‘ডেড পোর্ট’ বা ব্যর্থ বন্দরে পরিণত করার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
৪. মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর : ভবিষ্যতের প্রধান ভরসা: বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ লজিস্টিকস সঙ্কট সমাধানের একমাত্র কার্যকর আলো ছড়াচ্ছে কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন এই গভীর সমুদ্রবন্দরটি চালু হলে তা জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে সরাসরি ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান রাখবে বলে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।
মাতারবাড়ীর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এর প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত গভীরতা। যেখানে চট্টগ্রাম বন্দরে মাত্র ৯.৫ মিটার এবং আড়াই হাজার টিইইউএস কনটেইনারবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে, সেখানে মাতারবাড়ী বন্দরে ১৬ মিটারের বেশি ড্রাফট এবং আট হাজার টিইইউএসের বেশি কনটেইনার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন বিশাল মাদার ভেসেল সরাসরি জেটিতে ভিড়তে পারবে।
ইতোমধ্যে জাপানি উন্নয়ন সংস্থা জাইকার (ঔওঈঅ) সহায়তায় ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ, ২৫০ মিটার চওড়া এবং ১৮.৫ মিটার গভীরতার একটি বিশাল সামুদ্রিক চ্যানেল নির্মাণের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। বর্তমানে এই চ্যানেলটিকে আরো ১০০ মিটার প্রশস্ত করার কাজ চলছে। এছাড়া বার্ষিক আট লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা সম্পন্ন ৭৬০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস টার্মিনাল এবং মূল জাতীয় মহাসড়কের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ফোর-লেন পোর্ট অ্যাক্সেস রোড নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মোংলা বা পায়রা দিয়ে ভবিষ্যৎ চাহিদা মেটানো অসম্ভব বিধায়, মাতারবাড়ী এবং চট্টগ্রামের বে-টার্মিনালই হবে দেশের অর্থনীতির মূল রক্ষাকবচ।
নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সার্বিক বিষয় এবং বে-টার্মিনালের অগ্রগতি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন: ‘বে-টার্মিনাল দেশের জন্য একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বড় প্রকল্প। এটি নিয়ে আন্তর্জাতিক কনসালট্যান্টরা দিনরাত কাজ করছেন। কোনো প্রকার অনুমাননির্ভর বা নেতিবাচক তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে আমাদের মাঠপর্যায়ের গ্রাউন্ড ব্রেকিং (মূল নির্মাণকাজ শুরু) পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিত। বিশ্বব্যাংক অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে স্টাডি ও সমীক্ষা করেই বে-টার্মিনালের ব্রেক-ওয়াটারের জন্য ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। আমাদের কিছু প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং সেগুলো যাতে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ওভারকাম করা যায়, তার চেষ্টা চলছে। সাউথ আফ্রিকায় বর্তমানে এই প্রকল্পের একটি থ্রিডি সিমুলেশনের কাজ চলছে, সেটি সম্পন্ন হওয়ার পরই আমরা বিনিয়োগ ও নকশার চূড়ান্ত রূপরেখা নিশ্চিত করতে পারব।’
অন্য দিকে, মোংলা বন্দরের বর্তমান স্থবিরতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বিষয়ে জানতে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য কমোডর মো: শফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য না করে দায়িত্বরত অফিসিয়াল স্পোকসম্যানের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন।
পরবর্তীতে মোংলা বন্দরের জনসংযোগ বিভাগের ইনচার্জ খন্দকার মনির বলেন: ‘ভারতের লোন অফ ক্রেডিটের (এলওসি) আওতাধীন আধুনিকীকরণ প্রকল্পটি এই মুহূর্তে সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। তবে চীনের অর্থায়নে জিটুজি প্রকল্পটির কাজ মাঠপর্যায়ে চলমান আছে। এর বাইরে বন্দরের সক্ষমতা ও জেটির ব্যবহার বাড়াতে নতুন কিছু আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে, যা দ্রুতই আলোর মুখ দেখবে।’
লজিস্টিকস ও মেরিটাইম খাতের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলো কেবল পণ্য আনা-নেয়ার কেন্দ্র নয়, বরং দেশের শিল্পায়নের কাঁচামাল স্বল্প খরচে পৌঁছানোর মূল প্রবেশদ্বার। যেহেতু বিদ্যমান অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সীমা আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে, তাই বে-টার্মিনালের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে দ্রুত বৈশ্বিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করাই হবে আগামী দিনের মূল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।