ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামিকে খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
- মানবতাবিরোধী অপরাধ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পরোয়ানাভুক্ত নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ৭ আসামিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের স্থায়ী ও অস্থায়ী কোনো ঠিকানাতেই তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।
গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারিক প্যানেলে এই তথ্য জানানো হয়। অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন এই প্যানেলের অন্য সদস্য হলেন জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
আদালতে প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম জানান, গত ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল এই ৭ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেফতারে অভিযান চালালেও কাউকে খুঁজে পায়নি। সাতজনের মধ্যে ছয়জনের বিষয়ে পুলিশি প্রতিবেদন জমা পড়েছে, একজনের প্রতিবেদন এখনো প্রক্রিয়াধীন। সব ক’টি প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর ট্রাইব্যুনাল পরবর্তী আদেশ দেবেন।
গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন- সাবেক সড়ক যোগাযোগও সেতুমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত; যুবলীগ সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ (শেখ পরশ), সাধারণ সম্পাদক মইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
এর আগে গত ১৮ ডিসেম্বর চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। শুনানিতে জানানো হয়, ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে হত্যাযজ্ঞে সরাসরি নির্দেশ, প্ররোচনা ও উসকানি দেয়ার সুনির্দিষ্ট তিনটি অভিযোগ (কাউন্ট) আনা হয়েছে। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট দায় তুলে ধরা হয়।
আবু সাঈদের মামলা : এ দিকে গত বছরের জুলাই আন্দোলনে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা মো: রুহুল আমিন (আইও) টানা তৃতীয় দিনের মতো তার জবানবন্দী দেন। ট্রাইব্যুনাল তার সাক্ষ্যগ্রহণ পুনরায় শুরু করার জন্য আগামী ৬ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
জবানবন্দীতে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ২০২৪ সালের নিরীহনিরস্ত্র ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভিসি হাসিবুর রশীদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও অন্য আসামিদের বেআইনি কার্যক্রম প্রতিরোধে কোনোরূপ ব্যবস্থা নেননি তিনি।
এ মামলার আরেক পলাতক আসামি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়কার রংপুর মহানগর পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মো: মনিরুজ্জামান। তার বিষয়ে জবানবন্দীতে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, মনিরুজ্জামানও ২০২৪ সালের নিরীহ নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ছাত্রলীগ সদস্যদের সহযোগিতা ও ইন্ধনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তাদের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে আবু সাঈদকে নির্বিচার গুলি করে হত্যা এবং অন্যদের গুরুতর জখম করার নির্দেশ দেন। সেই সাথে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন। অপ্রাপ্তবয়স্ক ও নিরীহ ছাত্র-জনতাকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে নির্যাতনের মাধ্যমে হয়রানি করেন। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কোনোরূপ ব্যবস্থা নেননি তিনি।
আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ছয় আসামি গ্রেফতার আছেন। তাদের মধ্যে একজন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর শরিফুল ইসলাম। তার বিষয়ে জবানবন্দীতে তদন্ত কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, শরিফুল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা সত্ত্বেও অন্য আসামিদের বেআইনি কার্যক্রম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেননি। আবু সাঈদকে হত্যা এবং অন্যদের গুরুতর জখম করার ঘটনায় উসকানি দেন ও সহযোগিতা করেন। এ ছাড়া আন্দোলন দমনে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের বেআইনি কার্যক্রম নিবারণে কোনোরূপ ব্যবস্থা নেননি। জবানবন্দীতে তদন্ত কর্মকর্তা আরো বলেন, আবু সাঈদকে হত্যা এবং অন্যদের গুরুতর জখম করতে উসকানি দেন ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি পোমেল বড়ুয়া। এ ছাড়া তিনি গত বছরের ১১ জুলাই আবু সাঈদকে থাপ্পড় মারেন।
পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায় আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যা করেন বলেও জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন এই তদন্ত কর্মকর্তা।