দিনাজপুরে সাদাসিধে সফরে প্রধানমন্ত্রী বিস্ময়ে স্থানীয়রা

Printed Edition

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ - দিনাজপুর থেকে

“এতদিন টিভিতে আর মোবাইলের পর্দায় দেখেছি। এবার সামনে থেকে দেখলাম। স্বপ্ন পূরণ হলো আমার। তার পিতাকেও দেখেছিলাম তখন আব্বার কাঁধে চড়ে এসেছিলাম।”

কথাগুলো বলতে বলতে আবেগে ভেসে যাচ্ছিলেন দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দা মো: মজিবুর রহমান। বয়স এখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। জীবনের অনেক স্মৃতি পেরিয়ে গেলেও এমন একটি দিনের কথা হয়তো দীর্ঘদিন মনে রাখবেন তিনি। কারণ, তার ভাষায়- “প্রধানমন্ত্রীকে এত কাছে থেকে দেখব, ভাবিনি কখনো।”

গতকাল সোমবার (১৬ মার্চ) দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ঘিরেই এমন অনুভূতির জন্ম স্থানীয় মানুষের মধ্যে। দেশের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান ওই দিন সেখানে যান সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করতে। কিন্তু সফরটি ছিল না প্রচলিত রাজনৈতিক সফরের মতো জাঁকজমকপূর্ণ। বরং ছিল একেবারেই সাদাসিধে, যা স্থানীয়দের কাছে ছিল বিস্ময়ের মতো।

সন্দেহ থেকে বিস্ময় : মজিবুর রহমান জানান, আগের দিন পর্যন্তও তিনি বিশ্বাস করতে পারছিলেন না যে সত্যিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেখানে আসবেন।

তিনি বলেন, “পরিচিতদের বারবার জিজ্ঞেস করেছি- সত্যিই কি তিনি আসবেন? কারণ এলাকায় তেমন কোনো প্রস্তুতি তো দেখি না। ভাবছিলাম হয়তো অন্য কোনো নেতা আসবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সত্যিই তিনি এলেন।”

স্থানীয় অনেকের মধ্যেই এমন সংশয় ছিল। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাধারণত কোনো প্রধানমন্ত্রী বা বড় রাজনৈতিক নেতা কোনো এলাকায় সফরে এলে কয়েক দিন আগেই শুরু হয় নানা প্রস্তুতি- ব্যানার, পোস্টার, স্বাগত তোরণ, মাইকিং কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর কড়াকড়ি।

কাহারোলের মানুষ সেই পরিচিত দৃশ্যের খুব একটা কিছুই দেখেননি।

সময়মতো আগমন : সোমবার বেলা ১২টা ২৪ মিনিটে কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়া এলাকায় পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ পোশাকেই তাকে দেখা যায়। গায়ে ছিল ঘিয়ে রঙের একটি টি-শার্ট ও নীল জিন্স প্যান্ট। মাথায় পরে নেন লাল-সবুজ রঙের একটি ক্যাপ। পুরো সাজে কোনো আনুষ্ঠানিকতা বা রাজনৈতিক জাঁকজমকের ছাপ ছিল না।

গাড়ি থেকে নামার পর উপস্থিত মানুষের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান তিনি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অনুষ্ঠানের মূল কর্মসূচিতে অংশ নেন।

বেলা ১২টা ২৮ মিনিটে তিনি কোদাল দিয়ে মাটি কেটে আনুষ্ঠানিকভাবে সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। অনেকের মতে, এই দৃশ্যটি তাদের মনে করিয়ে দেয় তার বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সেই সময়ের কর্মসূচিগুলোর কথা যখন গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্পে সরাসরি মাঠে গিয়ে কাজের সূচনা করতেন তিনি।

এরপর বেলা ১২টা ৩০ মিনিটে খালের পাড়ে একটি গাছের চারা রোপণ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা দিতেই এই প্রতীকী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

দেশব্যাপী কর্মসূচির অংশ : সাহাপাড়া খাল পুনঃখনন প্রকল্পটি একটি বৃহত্তর কর্মসূচির অংশ। দেশব্যাপী নদী, খাল, নালা ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন উদ্যোগের আওতায় একই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে মোট ৫৪টি খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়।

সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাহাপাড়া খালটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে খালটির স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে পড়েছিল। পুনঃখনন সম্পন্ন হলে এলাকার কৃষি ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, খালটি পুনঃখনন করা হলে প্রায় ৩১ হাজার কৃষক সরাসরি সেচ সুবিধা পাবেন। প্রায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমি সেচের আওতায় আসবে।

ফলে বর্তমানে যে পরিমাণ ফসল উৎপাদন হচ্ছে, তার তুলনায় বছরে প্রায় ৬০ হাজার মেট্রিক টন বেশি ফসল উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

এ ছাড়া সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এই প্রকল্প থেকে উপকৃত হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঢাকার বাইরে এক ব্যতিক্রমী সফর : প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি ছিল ঢাকার বাইরে একেবারেই সংক্ষিপ্ত এবং আনুষ্ঠানিকতাবিহীন। সোমবার সকালে তিনি ঢাকা থেকে বিমানযোগে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে সড়কপথে সৈয়দপুর-দশমাইল-কাহারোল রুট ধরে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় যান।

সৈয়দপুর থেকে কাহারোলের দূরত্ব প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার। সাধারণত বড় রাজনৈতিক সফরে পথে পথে দলীয় নেতাকর্মীদের সমাবেশ, ব্যানার-ফেস্টুন কিংবা স্বাগত তোরণ দেখা যায়। কিন্তু এই সফরে সড়কজুড়ে তেমন কোনো দৃশ্য চোখে পড়েনি।

নেই ব্যানার, নেই তোরণ : সৈয়দপুর থেকে দিনাজপুর পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কজুড়ে কোথাও নেতাকর্মীদের স্বাগত তোরণ, ব্যানার বা ফেস্টুন চোখে পড়েনি। সড়কের পাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত উপস্থিতিও ছিল না। পুরো সফরটি যেন অনেকটাই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই মিশে ছিল।

স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা যেন রাজনৈতিক সফর না বরং এলাকার একজন পরিচিত মানুষ এসে কাজ শুরু করে গেলেন।”

পুরনো স্মৃতির সাথে তুলনা : মজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট একটি ঘটনা। তিনি বলেন, বহু বছর আগে এই এলাকায় সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এসেছিলেন।

তিনি বলেন, “এরশাদ সাহেব যখন এসেছিলেন, তার কয়েক দিন আগে থেকেই সেনাবাহিনী পুরো এলাকা ঘিরে রেখেছিল। তিনটি হেলিকপ্টার নিয়ে এসেছিলেন। চার দিকে উৎসবের মতো পরিবেশ ছিল। কিন্তু এবার সবকিছু একেবারে সাদাসিধে।”

এই তুলনাই যেন দিনাজপুরের মানুষের মনে আলাদা করে দাগ কেটেছে।

সাধারণ মানুষের কাছে সহজ উপস্থিতি : সানারপাড় এলাকার বাসিন্দা ৭৫ বছর বয়সী ইসমাইল হোসেন বলেন, তাদের এলাকায় এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী এসেছেন তাও আবার হেলিকপ্টার ছাড়া।

তিনি বলেন, “আগে বড় নেতারা সাধারণত হেলিকপ্টারে করে আসতেন। তখন সাধারণ মানুষের কাছে যাওয়া খুব কঠিন হতো।”

তিনি আরো বলেন, “এবার দেখলাম মানুষ অনেক সহজেই অনুষ্ঠানস্থলের কাছাকাছি যেতে পেরেছে। ব্যানার-পোস্টারও তেমন ছিল না। সবকিছুই ছিল খুব স্বাভাবিক।”

বিস্ময় আর প্রত্যাশার দিন : সাহাপাড়া খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই দিন স্থানীয় মানুষের চোখে ছিল কৌতূহল, বিস্ময় আর কিছুটা প্রত্যাশা। অনেকে মোবাইল ফোনে ছবি তুলেছেন, কেউবা দূর থেকে তাকিয়ে দেখেছেন।

রাজনীতির বড় মঞ্চের বাইরে, একেবারে গ্রামীণ পরিবেশে এমন সরল আয়োজন যেন দিনাজপুরের মানুষকে কিছুটা ভিন্ন অভিজ্ঞতা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসবে।

তবে সেই প্রত্যাশার পাশাপাশি তাদের মনে আরেকটি স্মৃতিও রয়ে গেছে- একদিন হঠাৎ করেই সাদাসিধে পোশাকে একজন প্রধানমন্ত্রী এসে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে একটি খাল পুনঃখননের কাজ শুরু করে গেলেন।

দিনাজপুরের মানুষের কাছে সেটিই হয়তো এই সফরের সবচেয়ে বড় গল্প।