নিজ দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে দুই মন্ত্রী

জ্বালানি মজুদ ও চোরাচালান রোধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

Printed Edition
first-3
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ সচিবালয়ে সরকারদলীয় সংসদীয় সভায় সভাপতিত্ব করেন : পিআইডি

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশজুড়ে সড়কে অব্যবস্থাপনা, অসংখ্য হতাহতের ঘটনা এবং জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে নিজ দলের সংসদ সদস্যদের তোপের মুখে পড়েছেন সড়ক পরিবহন ও জ্বালানি মন্ত্রী। গতকাল শনিবার বিকেলে সংসদ ভবনে সরকারদলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা এমন তোপের মুখে পড়েন। বৈঠকে সাম্প্রতিক বাস ও ট্রেন দুর্ঘটনা, জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দুর্ঘটনা এবং জ্বালানি সঙ্কট রোধে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সংসদীয় কমিটিকে অবহিত করেছেন।

আজ রোববার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মুলতবি বৈঠক। তার আগে নিজ দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সংসদ সচিবালয়ের সরকারদলীয় সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ করে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে সরকার গঠনের পর থেকে নেয়া পদক্ষেপগুলো। তিনি সরকারের নেয়া পদক্ষেপ ও দেশব্যাপী ঘটে যাওয়া বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যদের মতামত জানতে চান। এরপরই সংসদ সদস্যরা তাদের মতামত প্রদান করেন।

একাধিক সংসদ সদস্য জানান, গতকালকের বৈঠকে পররাষ্ট্র, সড়ক ও জ্বালানি বিষয়েই আলোচনা হয়েছে। আজ দেড়টায় আবার সরকারদলীয় সদস্যদের বৈঠক বসবে। সেখানে জুলাই সনদ, গণভোটসহ সংসদের বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর আলোচনা হবে।

জানা গেছে, কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল তার বক্তব্যে দেশব্যাপী সড়কের মধ্যে হাটবাজার বসার বিষয়টি সামনে এনে বলেন, ঈদের আগে ও পরে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এসব অবৈধ হাটবাজার দায়ী। রাস্তা সরু হয়ে যাওয়ার কারণে সড়কে যান চলাচলে বিঘœ ঘটে। তিনি এসব অবৈধ হাটবাজার তুলে দেয়ার আহ্বান জানান।

লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য সাহাদাত হোসেন সেলিম বলেছেন, ঈদের আগে ও পরে টোল আদায়ে চরম অব্যবস্থাপনা লক্ষ করা গেছে। সরকার চাইলেই এগুলোর সমাধান করতে পারতো। টোল আদায়েই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে।

এ ছাড়া আলোচনায় উঠে আসে পদ্মায় বাস পড়ে অনেক মানুষের হতাহতের বিষয়টি। উঠে আসে ঈদে বাড়তি ভাড়াসহ ট্রেন সার্ভিসে গাফলতির বিষয়টিও।

সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে সড়কমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তার মন্ত্রণালয়ের নেয়া পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। তিনি ভবিষ্যতে সবার দেয়া মতামতগুলো বিবেচনায় নিয়ে কাজ করার আশ্বাস দেন।

এ ছাড়া বৈঠকে দেশব্যাপী জ্বালানি তেল নিয়ে অনিয়ম ও নানা অভিযোগের বিষয়ে উপস্থিত অনেক সদস্যই বলেন, সরকার বলছে, জ্বালানির কোনো সঙ্কট নেই। তাহলে তেল নিয়ে এত তালবাহানা কেন? তেল যদি থেকেই থাকে, তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে কেন? কয়েকজন সদস্য বলেছেন, তেল সিন্ডিকেট যদি থেকেই থাকে বা তেল যদি কেউ মজুদ করে রাখে, তাহলে সরকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন? কয়েকজন পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, তেলের দাম কমিয়ে দেয়া হোক। তাহলে যারা মজুদদারি করছেন, তারা তেল মজুদ করবে না।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ প্রতিবেদককে বলেন, জ্বালানি সঙ্কট নিয়ে সংসদ সদস্যরা তাদের মতামত দিয়েছেন। আমরা সেগুলোকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছি।

এর আগে বৈঠকের শুরুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব:) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের সহধর্মিণী দিলারা হাফিজের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে মরহুমার রূহের মাগফেরাত কামনা করে বিশেষ মুনাজাতে অংশ নেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্যরা। বৈঠক শেষে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকারের চলমান কার্যক্রম, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইন প্রণয়ন কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। তিনি বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি ও চোরাচালান রোধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সাথে সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

চিফ হুইপ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে তা নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। সরকার প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম ঠিক রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা চলছে। এমনকি সীমান্ত দিয়ে তেল পাচারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। এসব বন্ধে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিরুনি অভিযান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। ইতোমধ্যে দুই লাখ মেট্রিক টনের জাহাজ বন্দরে ভিড়েছে এবং আরো দুই লাখ মেট্রিক টন আসার পথে রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা জেলা ও স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করেন। বিশেষ করে কেউ যাতে অপ্রয়োজনে অতিরিক্ত তেল মজুদ করতে না পারে এবং তেলের দাম যেন কোথাও না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখতে বলা হয়েছে। রোববার সংসদ অধিবেশনে জ্বালানিমন্ত্রী এ বিষয়ে ৩০০ বিধিতে বিস্তারিত বক্তব্য রাখবেন।

চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশে এই প্রথম প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের বাধ্য করেছেন সংসদ সদস্যদের বিস্তারিত পরিস্থিতি অবহিত করতে, যাতে তারা এলাকাভিত্তিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। এখন থেকে প্রতি মাসে এ ধরনের ব্রিফিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে বলেও তিনি জানান।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে শনিবার বিস্তারিত আলোচনা না হলেও আশা করা যাচ্ছে, রোববারের বৈঠকে এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। এছাড়া সংরক্ষিত নারী আসন ও অন্যান্য বিল নিয়ে ৩০ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

জানা গেছে, বৈঠকে মন্ত্রীদের আরো দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতিগুলো ভালোভাবে রপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যার যার দায়িত্ব তাকে সঠিকভাবে পালন করতে হবে। কর্তব্যে অবহেলা করলে তাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। এছাড়া সংসদ সদস্যদের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দুর্নীতি, অপশাসন নিয়ে কথা বলতে বলেছেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে যে বিষয়গুলো বলেছেন, সেগুলোর ওপর জোর দিতে নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।