কেন নেদারল্যান্ডসের মানুষ জানালার পর্দা খোলা রাখে

Printed Edition

নয়া নিগন্ত ডেস্ক

সন্ধ্যায় নেদারল্যান্ডসের কোনো আবাসিক এলাকায় হাঁটতে বের হলে একটি বিষয় আপনার চোখে পড়বেই। ঘরের ভেতরের আলো জ্বলে ওঠে, আর রাস্তা থেকে অনেক সময়ই স্পষ্ট দেখা যায় মানুষের বসার ঘর। এমনকি পরিবারের একসাথে খাওয়া-দাওয়াও চোখে পড়ে। পৃথিবীর অনেক দেশে অন্ধকার নামলেই জানালার পর্দা টেনে দেয়া হয়। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে সেগুলো বেশির ভাগ সময়ই খোলা থাকে। এ নিয়ে নানা ব্যাখ্যাও প্রচলিত আছে।

একটি হলো ক্যালভিনবাদ, প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টধর্মের একটি ধারা, যা ডাচ ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ক্যালভিনবাদে সরলতা, সততা ও স্বচ্ছতাকে মূল্য দেয়া হয়। এই ধারণা অনুযায়ী, খোলা পর্দা বোঝায় যে, ঘরে লুকানোর কিছু নেই, জীবনযাপন সৎ ও শালীন। তবে গবেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি যথেষ্ট নয়। কারণ আধুনিক ডাচ সমাজ অনেকটাই ধর্মনিরপেক্ষ, তবুও এই অভ্যাস রয়ে গেছে।

আরেকটি ব্যাখ্যা জড়িয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাথে। জার্মান দখলদারিত্বের সময় কঠোর ‘ব্ল্যাকআউট’ নিয়ম চালু ছিল। রাতে ঘর থেকে যেন কোনো আলো বাইরে না বের হয়, সে জন্য জানালায় মোটা পর্দা বা ঢাকা ব্যবহার বাধ্যতামূলক ছিল।

আবহাওয়ার কথাও প্রায়ই শোনা যায়। নেদারল্যান্ডসে বিশেষ করে শরৎ ও শীতকালে সূর্যালোক খুব বেশি পাওয়া যায় না। দিন ছোট, আকাশ মেঘলা, সন্ধ্যা দীর্ঘ। ফলে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক আলো ঘরে ঢুকতে দেয়া মানুষ পছন্দ করে, এতে ঘর উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত লাগে। সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাটি সমাজজীবনের সাথে যুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘনিষ্ঠ ও পারস্পরিক আস্থাভিত্তিক সম্প্রদায়ে বসবাসকারীরা জানালার পর্দা খোলা রাখার প্রবণতা বেশি দেখান। খোলা জানালা মানুষকে রাস্তার সাথে একধরনের সংযোগ দেয়। কে যাচ্ছে, বাইরে কী হচ্ছে, সব ঠিকঠাক আছে কি না- এসব সম্পর্কে অদৃশ্য এক সচেতনতা তৈরি হয়। এতে পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ গড়ে ওঠে।

বাস্তব কারণও আছে। বিশেষ করে শহরের ডাচ বাড়িগুলো অনেক সময় সরু হয়, কিন্তু সামনের জানালা বড়। পর্দা টানলে আলো কমে যায়, ঘর ছোট ও গুমোট লাগে। তাই অনেকেই খোলামেলা, আলোভরা পরিবেশ পছন্দ করেন।

সবশেষে আছে এক নীরব সামাজিক বোঝাপড়া। যেহেতু অনেকেই পর্দা খোলা রাখেন, সবাই জানে কিভাবে আচরণ করতে হয়। এখানে গোপনীয়তা রক্ষা হয় কাপড়ের পর্দায় নয়, বরং সামাজিক শিষ্টাচারে।