হৃদয়ের প্রকারভেদ
Printed Edition
যোবায়ের শাহী সৈকত
লুকমান হাকিম ছিলেন অন্যতম একজন জ্ঞানী ব্যক্তি। তিনি নবীও ছিলেন না রাসূলও ছিলেন না। তবুও তাঁর কথা আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা এত পছন্দ করেছেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার নামে পবিত্র কুরআনে ‘সূরা লুকমান’ নামে একটি সূরাই নাজিল করে দিয়েছেন। কিন্তু লুকমান ছিলেন একজন কৃতদাস।
লুকমান এত জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন যে, তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা শোনার জন্য হাজার হাজার লোক জমা হয়ে যেত। আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বক্তৃতা সবাই শুনত। একদিন কিছু লোক এসে লুকমানের মনিবকে বলল, আপনার কৃতদাস লুকমানের অনেক বুদ্ধি। তারা সবাই এসে মনিবের কাছে লুকমানের জ্ঞানের প্রশংসা করতে লাগল। সে তার ক্রীতদাস লুকমানের এত জ্ঞানের কথা শুনে অবাক হয়ে গেল। মনিব মনে মনে ভাবল, আমি লুকমানের জ্ঞানের পরীক্ষা নেব। দেখব, লুকমানের জ্ঞানের পরিধি কতটুকু। লুকমান বাড়িতে এলে তার মনিব তাকে বলল শুনলাম, তোমার নাকি অনেক জ্ঞান। আজ আমি তোমার জ্ঞানের পরীক্ষা নেব। মনিব লুকমানকে একটি ছাগল জবাই করে দিলো। আর বলল, এই ছাগল থেকে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট অংশটি বের করো। লুকমান ছাগলটি কেটে তার ‘হৃৎপিণ্ডটি’ বের করল। এবার লুকমানের মনিব অন্য একটি ছাগল দিয়ে বললেন, এই ছাগল থেকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশ বের করো।
লুকমান সবাইকে অবাক করে দিয়ে আবার একই কাজ করলেন। তিনি আবার ছাগলের হৃৎপিণ্ডটিই বের করলেন। তা হলে দেখা গেল লুকমান হাকিমের কথা অনুযায়ী, কোনো প্রাণীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট অংশ তার ‘হার্ট বা অন্তর কিংবা কালব’ আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট অংশও তার ‘হার্ট কিংবা অন্তর বা কালব অথবা হৃৎপিণ্ড’। লুকমান হাকিমের হার্ট বা হৃদয় নিয়ে পরীক্ষার কয়েক হাজার বছর পর আল্লাহর Last and Final Messenger মহানবী হজরত মোহাম্মদ সা: ‘অন্তর বা হার্ট’ সম্পর্কে লুকমান হাকিমের কথার মতো একই মতামত দিলেন।
মহানবী সা: বললেন, মানুষের দেহে একটি গোশতের টুকরো আছে যেটি নষ্ট হয়ে গেলে পুরো দেহ নষ্ট হয়। আর সেটি যদি ভালো থাকে তবে সম্পূর্ণ দেহই ভালো থাকে। আর সেই গোশতের টুকরাটির নাম ‘কালব বা হৃৎপিণ্ড বা অন্তর।’ পরবর্তীতে গ্রেট ইসলামিক স্কলার ইবনে তাইমিয়া এই ‘হার্ট বা হৃৎপিণ্ড বা অন্তর বা কালবকে’ তিন ভাগে ভাগ করেছেন।
সুস্থ অন্তর : এই শ্রেণীর মানুষ সবসময় কুরআনের দেখানো পথে চলে। কুরআনে আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা মেনে চলে। কুরআনে আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকে। তার কাছে ইসলাম ভালো লাগে, ইসলামী বিধান, ইসলামী আইন, ইসলামী রাজনীতি ভালো লাগে। পক্ষান্তরে ইসলামবিরোধী সব কাজকে এরা মন থেকে ঘৃণা করে এবং সব ধরনের পাপকাজ থেকে সর্বদা বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।
অসুস্থ অন্তর : এই শ্রেণীর মানুষ একদিকে ওয়াজ মাহফিল শুনতে যায়। অন্য দিকে ফেরার পথে সিনেমা হলে ঢুকে পড়ে। একদিকে মোবাইলে জাকির নায়েকের লেকচার শুনে অন্য দিকে সুযোগ পেলে পর্নো দেখে। এক দিকে ইসলামবিরোধী কাজে সহযোগিতা করে অন্য দিকে মক্কায় গিয়ে হজ পালন করে। এরা এক দিকে আল্লাহ এবং অন্য দিকে শয়তান উভয়কেই খুশি রাখতে চায়। এরা মুনাফিক টাইপের মুসলমান। আর এই মুনাফিকদের স্থান হচ্ছে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে।
মৃত অন্তর : এ ধরনের মানুষ সরাসরি আল্লাহকেই অস্বীকার করে। এরা আল্লাহর কুরআন-হাদিস বা ইসলামী আইনকে নিয়ে বিদ্রƒপ করে, তামাশা করে। এরা নাস্তিক শ্রেণীভুক্ত। কিন্তু আমরা যদি একটু লক্ষ করি তাহলে দেখতে পাব, সারা দুনিয়ায় পিওর বা ডেড হার্টের চেয়ে ill heart বা অসুস্থ অন্তরের লোক বেশি। সুতরাং, এ থেকে বুঝা যাচ্ছে- সারা দুনিয়ায় মুনাফিক মুসলমানের সংখ্যা বেশি। তাই আমরা যদি আমাদের ill heart-কে Pure heart-এ রূপান্তরিত করতে চাই, তাহলে কুরআনকে আমাদের জীবনে Complete code of life পরিপূর্ণ জীবন বিধান হিসেবে মেনে চলতে হবে।
লেখক : কলামিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক