রাজধানী সুপার মার্কেটে প্রত্যাশা মিটছে না ব্যবসায়ীদের

ঈদ বাজার

Printed Edition
back-2
রাজধানী সুপার মার্কেটে প্রত্যাশা মিটছে না ব্যবসায়ীদের

হাবিবুল বাশার

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী রাজধানী সুপার মার্কেটে কেনাকাটার ব্যস্ততা বাড়লেও ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্রেতাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী। বিক্রির দিক থেকে এগিয়ে আছে তাই শিশু ও নারীদের পোশাক।

রাজধানী সুপার মার্কেটটি মূলত ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি কোনো সরকারি খাস জমিতে নয়; বরং এটি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মালিকানাধীন জায়গায় নির্মিত। মূলত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ফান্ড বা তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই এই বিশাল মার্কেটটি গড়ে তোলা হয়েছিল। মার্কেটটি যখন শুরু হয়, তখন এটি মূলত টিনশেড কাঠামোর একটি বড় বাজার ছিল। তখন থেকেই এটি সাধারণ মানুষের কাছে সস্তা এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যের জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে মার্কেটের চাহিদা বাড়লে পাশের খালি জায়গায় ‘নিউ রাজধানী সুপার মার্কেট’ অংশটি চালু করা হয়। এই মার্কেটের ইতিহাসে অগ্নিকাণ্ডের বেশ কিছু বড় ঘটনা রয়েছে। বিশেষ করে ২০১৯ সালের ভয়াবহ আগুন মার্কেটের অবকাঠামো এবং ব্যবসায়ীদের বড় ক্ষতি করেছিল, যার পর এটি পুনরায় সংস্কার করা হয়।

রাজধানী সুপার মার্কেট তার ভৌগোলিক অবস্থান এবং পণ্যের দাম সস্তার কারণে একটি বিশাল এলাকা দখল করে আছে। মূলত পুরান ঢাকা এবং দক্ষিণ ঢাকার বাসিন্দারাই এই মার্কেটের প্রধান ক্রেতা। টিকাটুলী, ওয়ারী, স্বামীবাগ , গোপীবাগ, হাটখোলা ও বনগ্রাম- এই এলাকাগুলোর মানুষ তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় এবং উৎসবের কেনাকাটার জন্য রাজধানী মার্কেটের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। পরিবহন সুবিধা (বিশেষ করে হানিফ ফ্লাইওভার এবং সায়েদাবাদ বাসটার্মিনাল) ভালো হওয়ায় যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, ডেমরা, শনির আখড়া, সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া, মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকা থেকেও প্রচুর মানুষ আসে। যেহেতু এটি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অধীনে একটি বড় পাইকারি হাব, তাই ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ এবং নরসিংদী থেকে অনেক ছোট ব্যবসায়ী এখান থেকে পাইকারি মালামাল নিতে আসেন।

ব্যবসায়ীদের মতে, মার্কেটে এক হাজার ৭০০-এর বেশি দোকান রয়েছে। গড়ে প্রতিটি দোকানে প্রতিদিন যদি ৩০-৪০ হাজার টাকার বিক্রি ধরা হয়, তবে মোট অঙ্কটি বিশাল দাঁড়ায়। তবে দোকানভেদে এই বিক্রির পরিমাণ ভিন্ন হয়; কাপড়ের বড় শোরুমগুলোতে বিক্রি অনেক বেশি, আবার ছোট কসমেটিকসের দোকানে অনেক কম।

পোশাকের পরিচিতি : রাজধানী সুপার মার্কেট মূলত পোশাকের স্বর্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত। সরেজমিন তথ্যানুযায়ী, এখানে একদম সস্তা থেকে শুরু করে প্রিমিয়াম কোয়ালিটির সবধরনের পোশাক পাওয়া যায়।

নারীদের পোশাক

থ্রি-পিস ও আনস্টিচড ফেব্রিকস : সুতি, লিনেন, জর্জেট এবং সিল্কের থ্রি-পিসের বিশাল কালেকশন এখানে পাওয়া যায়। বিশেষ করে পাকিস্তানি ও ইন্ডিয়ান ড্রেসের রেপ্লিকা এখানে খুব জনপ্রিয়।

শাড়ি : টাঙ্গাইলের তাঁত, জামদানি, কাতান, বেনারসি থেকে শুরু করে জর্জেট ও শিফন শাড়ির বড় বড় শোরুম রয়েছে। বিয়ের শাড়ির জন্যও অনেকে এখানে আসেন।

কুর্তি ও কামিজ : রেডিমেড ডিজাইনার কুর্তি এবং সিঙ্গেল কামিজের জন্য আলাদা গলি রয়েছে।

পুরুষদের পোশাক : জিন্স ও গ্যাবার্ডিন প্যান্ট : এখানে স্থানীয়ভাবে তৈরি (এক্সপোর্ট কোয়ালিটি) এবং আমদানিকৃত জিন্স প্যান্ট খুব সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যায়।

শার্ট ও টি-শার্ট : ক্যাজুয়াল শার্ট, ফরমাল শার্ট এবং ট্রেন্ডি টি-শার্টের শতাধিক দোকান রয়েছে।

পাঞ্জাবি : উৎসবের সময় পাঞ্জাবির জন্য এই মার্কেটটি ঢাকার অন্যতম প্রধান গন্তব্য হয়ে ওঠে।

শিশুদের পোশাক (কিডস জোন)

ছোট শিশুদের জিরো সাইজ থেকে শুরু করে কিশোর বয়স পর্যন্ত সবধরনের রঙিন ও আরামদায়ক পোশাক এখানে পাওয়া যায়। বিশেষ করে বাবুদের পার্টি ড্রেস এবং সুতি সেট এখানে খুব বেশি বিক্রি হয়।

শীতকালীন পোশাক

ব্লেজার, সোয়েটার, হুডি, জ্যাকেট এবং মাফলারের বিশাল বাজার বসে এখানে। কম্বল এবং চাদরের জন্যও রাজধানী মার্কেট বেশ বিখ্যাত।

পর্দা ও বেডশিট (হোম টেক্সটাইল)

যদিও এগুলো গায়ে দেয়ার পোশাক নয়, তবে টেক্সটাইল পণ্য হিসেবে রাজধানী মার্কেটের দোতলা পর্দার কাপড় এবং বিছানার চাদরের জন্য ঢাকার মধ্যে সেরা জায়গাগুলোর একটি। রাজকীয় ডিজাইনের পর্দা এখানে পছন্দ ও চাহিদা মতো বানিয়ে নেয়া যায়।

ব্যবসায়ীদের পর্যবেক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা

মার্কেটের বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে। কিছুদিন আগে বেচাকেনা না থাকলেও এখন ক্রেতাদের আনাগোনা দেখা যায়।

দুলহান চুড়ি হাউজ দোকানের মালিকের মতে, ঈদ বাজারের যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা ছিল, তা এখনো সেভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। তবে উৎসবের বাকি দিনগুলোতে ভালো বিক্রির আশায় তারা আছেন।

নাবিলা ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী রাশেদুল হাসান জানান, বর্তমানে রমজানের কেনাকাটার ভরা মৌসুম চলছে। আল্লাহর রহমতে তাদের বেচাকেনা বেশ ভালো এবং সামনে আরো লাভের প্রত্যাশা করছেন তিনি।

পাঞ্জাবির বাজারে চিত্রটি কিছুটা হতাশাজনক। আল ইখলাস ব্র্যান্ড পাঞ্জাবি কর্নার শোরুম ম্যানেজার ইমরান হোসেন জানান, এখানে ক্রেতাদের উপস্থিতি নগণ্য। ইফতারের পর সামান্য কিছু বিক্রি হলেও সামগ্রিক অবস্থা মন্দা। তার মতে, বর্তমানে নারী ও শিশুদের পোশাক বেশি বিক্রি হলেও পাঞ্জাবির বাজারে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়েও খারাপ।

এ দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে দুই দর্শনার্থী তাদের ফুফুর সাথে কেনাকাটা করতে এসেছেন। মূলত ঈদ উপলক্ষে ঢাকাতে বেড়াতে এসেই তারা রাজধানী মার্কেটকে কেনাকাটার জন্য বেছে নিয়েছেন।

একসময় একজন দম্পতির দেখা মিলল মার্কেটের ভেতরে। কী কী কেনাকাটা করেছেন জিজ্ঞেস করা হলে জানালেন, আমরা দু’জন এসেছি ছোটদেরকে কিছু কিনে দেয়ার জন্য।

নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা

ওবায়দুর রহমান ফুলমিয়া রাজধানী মার্কেটের সিকিউরিটি গার্ড ইনচার্জ। তিনি বলেন, আমরা দুই শিফটে ৩০ জন নিরাপত্তাকর্মী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করি মার্কেটের শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সরকারিভাবে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাতে দুইজন পুলিশ আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য দেয়া হয়।