গাজায় যুদ্ধবিরতির ছয় মাসেও অনিশ্চয়তায় স্থিতিশীলতা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর ঘোষিত যুদ্ধবিরতির ছয় মাস পরও গাজা উপত্যকার বাস্তবতা স্থিতিশীল হয়নি বরং এটি এখন “না যুদ্ধ, না শান্তি”-এমন এক অনিশ্চিত অবস্থায় আটকে আছে। দুই বছরব্যাপী রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাতের পর এই চুক্তি গাজাবাসীর জন্য স্বস্তি ও পুনর্গঠনের আশার বার্তা নিয়ে এলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। খবর আলজাজিরার।

চুক্তির মূল শর্ত ছিল পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, ইসরাইলি বাহিনীর ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, সীমান্ত ক্রসিং খুলে দেয়া, পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করা। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এসব প্রতিশ্রুতির অধিকাংশই আংশিক বা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময়েও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। অক্টোবর ২০২৫ থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত দুই হাজারের বেশি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহতের সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে, যা এই চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। মানবিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। জাতিসঙ্ঘের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা অনেক কম। ফলে খাদ্যসঙ্কট, অপুষ্টি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এখনো তীব্র আকারে বিদ্যমান। যুদ্ধকালীন সরবরাহ বিপর্যয়ের প্রভাব এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। রাফাহ সীমান্ত আংশিক খোলা হলেও চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। হাজার হাজার গুরুতর রোগী বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন না। একই সাথে নির্মাণসামগ্রী প্রবেশে বিধিনিষেধ থাকায় পুনর্গঠন কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে আছে।

মাঠ পর্যায়ে “ইয়েলো লাইন” নামে একটি বিভাজন রেখা তৈরি করে গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত হয়েছে। এ দিকে ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। সাম্প্রতিক সঙ্ঘাতের কারণে ত্রাণ সরবরাহ ও সীমান্ত কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যা গাজার মানবিক সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে।

গাজা দখলের ‘শপথ’ ইসরাইলের অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের

গাজা সীমান্ত ঘেঁষে ইসরাইলি অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে নতুন করে সম্প্রসারণবাদী মনোভাব জোরদার হচ্ছে। সীমান্তের কাছে একটি পিকনিক স্পটে জড়ো হয়ে তারা ‘আমাদের গাজা’ স্লোগানে পুরো উপত্যকা দখলের পরিকল্পনা প্রকাশ করছে। তাদের দাবি, গাজার নিয়ন্ত্রণ ইসরাইলের হাতে থাকা উচিত এবং ফিলিস্তিনিদের একটি অংশকে সরে যেতে হবে। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।

এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক ধারা, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর। তাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক তরুণ ও ধর্মীয় গোষ্ঠী বৃহত্তর ইসরাইল গঠনের স্বপ্ন দেখছে, যার মধ্যে গাজা, পশ্চিম তীর, গোলান মালভূমি এমনকি দক্ষিণ লেবাননের অংশও অন্তর্ভুক্ত।

অন্য দিকে গাজার ভেতরের বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সঙ্ঘাত ও ধ্বংসযজ্ঞের ফলে সাধারণ মানুষ চরম মানবিক সঙ্কটে রয়েছে। খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার অভাবে তারা প্রতিনিয়ত স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি বরং অনিশ্চয়তা ও ভয় এখনো বিরাজ করছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর শুরু হওয়া সঙ্ঘাত গাজাকে ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত করেছে। যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নেয়া হলেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় স্থায়ী সমাধান অনিশ্চিত। মার্কিন মধ্যস্থতায় গঠিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ দিকে ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসতি সম্প্রসারণ আর প্রান্তিক মত নয় বরং এটি ক্রমেই রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিতে রূপ নিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো সঙ্ঘাত ও অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে, যা অঞ্চলটির শান্তি প্রক্রিয়াকে আরো কঠিন করে তুলবে।

গাজায় ‘পদ্ধতিগত অনাহার নীতি ইসরাইলের

গাজা সরকার বলছে, ইসরাইল খাদ্য সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেখানে “পদ্ধতিগত অনাহার নীতি” বাস্তবায়ন করছে। সরকারি মিডিয়া অফিসের বরাতে আনাদোলু জানিয়েছে, আটা ও মৌলিক খাদ্যপণ্যের প্রবাহ ইচ্ছাকৃতভাবে সীমিত করা হচ্ছে, ফলে ২৪ লাখের বেশি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, গাজায় দৈনিক প্রায় ৪৫০ টন আটা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে মাত্র ২০০ টন। এর ফলে রুটির উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে মাত্র প্রায় ৩০টি বেকারি চালু রয়েছে, যা প্রতিদিন প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার প্যাকেট রুটি উৎপাদন করছে,যা জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। গাজার সরকার জানায়, যুদ্ধ-পূর্ব সময়ের তুলনায় খাদ্যসহায়তার প্রবাহ এখনো ৩৮ শতাংশের বেশি নয়। তারা সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে রুটি উৎপাদন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে। হামাসও একই ধরনের অভিযোগ তুলে বলেছে, ইসরাইল মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধা দিয়ে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করছে। সংগঠনটির মুখপাত্র হাযেম কাসেম বলেন, খাদ্য ও আটা প্রবেশে বাধার কারণে গাজায় দারিদ্র্য ও খাদ্যসঙ্কট আরো তীব্র হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গাজা কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছে এবং সীমান্ত সম্পূর্ণ খুলে দিয়ে খাদ্য ও মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

আল-আকসা প্রাঙ্গণে অভিযান, উত্তেজনা বৃদ্ধি

ইসরাইলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর পূর্ব জেরুসালেমে অবস্থিত আল-আকসা প্রাঙ্গণে আবারও প্রবেশ করেছেন, যা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। ফিলিস্তিনি সূত্রের বরাতে আনাদোলু জানায়, ভারী পুলিশ নিরাপত্তার মধ্যে এই অভিযান চালানো হয়। সাধারণত এমন প্রবেশের আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অনুমতি প্রয়োজন হয়। তবে এই ধরনের পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিরা উসকানিমূলক হিসেবে দেখছে।

ঘটনাটি এমন সময় ঘটলো, যখন পূর্ব জেরুসালেমে মুসলিম ও খ্রিষ্টান পবিত্র স্থানগুলোতে প্রবেশে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সম্প্রতি পুরনো শহর এলাকায় অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় কড়াকড়ি আরোপের ঘটনাও ঘটেছে। আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান হিসেবে বিবেচিত। অন্য দিকে ইহুদিরা একই স্থানকে ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে দাবি করে। বেন-গভিরের এ ধরনের পদক্ষেপ অতীতেও আরব ও মুসলিম বিশ্বসহ আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনা জেরুসালেমে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

গাজায় বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ দাবি হামাসের

গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হামাস। সংগঠনটির মুখপাত্র হাযেম কাসেম দাবি করেন, সর্বশেষ হামলাগুলো ‘ভয়াবহ গণহত্যার’ ধারাবাহিকতা। খবর আনাদোলু এজেন্সির। কেন্দ্রীয় গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে হামলায় কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনায় হামাস তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। এ ছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় গুলিতে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

হামাসের দাবি, এসব হামলা প্রমাণ করে যে ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তির শর্ত মানছে না এবং মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টাকে উপেক্ষা করছে। তারা প্রথম ধাপের চুক্তি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

এ দিকে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই হামলাগুলো নিন্দা জানিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতির পরও শত শত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, যাতে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

গাজার অবরোধ ভাঙতে আবারো ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’র যাত্রার প্রস্তুতি

গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছতে অবরোধ ভাঙার উদ্দেশ্যে নতুন একটি নৌবহর স্পেনের বার্সেলোনা বন্দর থেকে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়েছে। “গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা” নামের এই উদ্যোগে প্রায় ৩০টি নৌযান অংশ নিচ্ছে, যেগুলোতে চিকিৎসা সামগ্রীসহ জরুরি সহায়তা রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা রয়টার্সের। আয়োজকদের লক্ষ্য, একটি “মানবিক করিডোর” তৈরি করা, যাতে গাজায় সহায়তা পৌঁছানো সহজ হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার কর্মী এই উদ্যোগকে সমর্থন জানিয়েছেন।

এর আগে একই সংগঠনের প্রায় ৪০টি নৌযান গাজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করলে ইসরাইলি বাহিনী তা বাধা দেয় এবং শতাধিক কর্মীকে আটক করে। উদ্যোক্তারা বলছেন, গাজায় প্রায় ২০ লাখ মানুষ এখনো অস্থায়ী আশ্রয়ে বসবাস করছে এবং তাদের কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধ ও আশ্রয় পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের আওতায় সঙ্ঘাতের সময়ও বেসামরিক জনগণের জন্য নিরাপদে সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করা রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব। এই নৌবহরের যাত্রা সফল হবে কিনা তা এখনো অনিশ্চিত; তবে এটিকে গাজার মানবিক সঙ্কটের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।