ইসরাইলি নির্যাতনের শিকার গাজামুখী নৌবহরের কর্মীরা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

গাজাগামী ত্রাণবহর আটকের সময় অন্তত ৩১ জন কর্মী আহত হয়েছেন বলে সংগঠকরা জানিয়েছেন। আহতদের মধ্যে বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। সংগঠনটির দাবি, আটক করার সময় তাদের ওপর সহিংস আচরণ করা হয়। অনেককে মারধর করা হয়েছে এবং টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কেউ কেউ গুরুতর আঘাত পেয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের আরো অভিযোগ, আটক অবস্থায় পর্যাপ্ত খাবার ও পানি দেয়া হয়নি এবং অমানবিক পরিবেশে রাখা হয়েছে। গাজাগামী ত্রাণবহরে অংশ নেয়া ব্রিটিশ কর্মী কেটি ডেভিডসন ইসরাইলি বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেছেন, তাদের সাথে ‘পশুর মতো আচরণ’ করা হয়েছে। শনিবার ইস্তাম্বুলে তিনি এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।

ডেভিডসন জানান, তাদের ছোট নৌযানটি আন্তর্জাতিক জলসীমায় হঠাৎ করে ইসরাইলি বাহিনী ঘিরে ফেলে। প্রথমে ড্রোনের তীব্র আলো ফেলে নজরদারি করা হয়, পরে একটি বড় যুদ্ধজাহাজ কাছে আসে। তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি ভয়ঙ্কর ছিল, আমরা বুঝতেই পারিনি কী ঘটছে।’ তিনি জানান, শুরুতে একটি জাহাজ সরে যাওয়ার পর তারা মনে করেছিলেন বিপদ কেটে গেছে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে আরেকটি নৌযান এসে তাদের ঘিরে ফেলে। তখন তারা ইতালির সিসিলি থেকে কয়েকদিন দূরে ছিলেন।

নৌযানে থাকা অবস্থায় আচরণ কিছুটা সহনীয় হলেও আটককেন্দ্রে নেয়ার পর পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ডেভিডসনের ভাষায়, একটি অস্থায়ী কারাগারে তাদের রাখা হয়, যা জাহাজের কনটেইনার দিয়ে তৈরি এবং চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া ছিল।

তিনি অভিযোগ করেন, ৪০ ফুটের কনটেইনারে ৬০ জনের বেশি মানুষকে গাদাগাদি করে রাখা হয়। ভেজা ফোমের বিছানায় থাকতে হয়েছে, এমনকি রাতে পানি ছিটিয়ে বিছানা ভিজিয়ে দেয়া হতো। খাবার হিসেবে দেয়া হতো শুধু রুটি ও পানি, আর প্রহরীদের আচরণ ছিল ‘হিংস্র ও আক্রমণাত্মক’। ডেভিডসন বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেন দুই কর্মী সাইফ আবু কেশেক ও তিয়াগো অ্যাভিলার নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি বলেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনেকেই নৌযান ছাড়তে রাজি হননি।

ডেভিডসন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘এটি শুধু ফিলিস্তিনের বিষয় নয়, বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়তে পারে।’ এই ঘটনা গাজার অবরোধ ও মানবিক সহায়তা নিয়ে চলমান সঙ্কটকে আরো জটিল করে তুলেছে।

বিভিন্ন দেশের নিন্দা ও প্রতিবাদ

গাজাগামী আন্তর্জাতিক ত্রাণবহর আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। স্পেন ও ব্রাজিল যৌথ বিবৃতিতে তাদের দুই নাগরিককে আন্তর্জাতিক জলসীমা থেকে আটক করার ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানিয়েছে। তারা এই ঘটনাকে ‘স্পষ্ট অবৈধ’ উল্লেখ করে বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারযোগ্য অপরাধ। দুই দেশই তাদের নাগরিকদের দ্রুত ও নিরাপদে ফেরত দেয়ার পাশাপাশি কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে। এদিকে ওয়ারশ-এ ইসরাইল দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে ‘ত্রাণ যেতে দাও’ এবং ‘অবরোধ বন্ধ করো’ স্লোগান দেন। তারা অভিযোগ করেন, একটি বেসামরিক ত্রাণবাহী জাহাজ আটকে দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে। একইসাথে পোল্যান্ড সরকার জানায়, তাদের একজন নাগরিক আটকের ঘটনায় তারা কূটনৈতিকভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে।

নেদারল্যান্ডের উট্রেখ্ট শহরেও বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে ত্রাণ সহায়তা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানান। বিক্ষোভকারীরা ‘গণহত্যা বন্ধ করো’ ও ‘অবরোধ ভাঙো’ স্লোগান দেন এবং সাময়িকভাবে যান চলাচলও বন্ধ করে দেন। একইভাবে ইতালির রোম, মিলান, নেপলস ও তুরিনসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেয়। তারা ত্রাণবহরে হামলাকে ‘সমুদ্র দস্যুতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দাবি করে এবং সরকারের কাছে কঠোর অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার দফতরও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি জানায়, আন্তর্জাতিক সমুদ্রে বিদেশী বেসামরিক জাহাজ আটক করা সাধারণত অনুমোদিত নয় এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তারা গাজায় জরুরি খাদ্য, চিকিৎসা ও অন্যান্য সহায়তা প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

গাজা পরিকল্পনায় ভাটা

গাজা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও সহায়তা সমন্বয়ের লক্ষ্যে গঠিত যুক্তরাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বাবধান কেন্দ্র শিগগিরই বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানিয়েছে রয়টার্স। এই কেন্দ্রটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা ও ত্রাণ প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য তৈরি হলেও বাস্তবে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। সূত্রগুলো বলছে, কেন্দ্রটির দায়িত্ব নতুন একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে। তবে এই পরিবর্তন বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, এতদিনেও কেন্দ্রটি যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে বা সহায়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়নি। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও হামলা অব্যাহত রয়েছে, ফলে এই উদ্যোগের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে গেছে। একইসাথে, বিভিন্ন দেশ এই ব্যবস্থায় অংশগ্রহণে আগ্রহ হারাচ্ছে বলেও জানা গেছে। এদিকে, গাজায় সহায়তা প্রবেশ এখনো সীমিত। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সামগ্রী প্রবেশে বাধা থাকায় পুনর্গঠন কার্যক্রমও থমকে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি গাজার ভবিষ্যৎ প্রশাসন ও পুনর্গঠনের পরিকল্পনাকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।

নিজেদের তাঁবু পুড়িয়ে প্রতিবাদ গাজার বাস্তুচ্যুতদের

গাজা শহরের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা নিজেদের বসবাসের তাঁবুতে আগুন দিয়ে বিরল এক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও নিরাপত্তা না ফেরায় এবং মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় তাদের এই প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। জেইতুন এলাকার দার আল-সালাম শিবিরে ‘ওরা পোড়ানোর আগে আমরা নিজেরাই পোড়াই’ স্লোগানে এই প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-শিশুসহ বহু মানুষ অংশ নেয় এবং দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানায়। তারা শিবিরকে গুলিবর্ষণ থেকে রক্ষার জন্য মাটির বাঁধ নির্মাণ এবং জরুরি খাদ্য ও পানির সরবরাহ বৃদ্ধির আহ্বান জানায়।

শিবিরবাসীরা জানান, যুদ্ধবিরতির পরও গুলির আতঙ্ক কমেনি। বাস্তুচ্যুত এক নারী বলেন, গুলি শুরু হলে তারা তাঁবুর ভেতরে মাটিতে শুয়ে পড়েন, কিন্তু তাতে কোনো সুরক্ষা মেলে না। দীর্ঘ দিন ধরে পানির সঙ্কট থাকায় দূর-দূরান্তে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আর খাদ্য সহায়তাও নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। আরেক বাসিন্দা বলেন, আগে অন্তত বোঝা যেত কখন হামলা শুরু হবে, কিন্তু এখন যেকোনো সময় গুলির শিকার হতে হচ্ছে। তিনি নিজেও একাধিকবার গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে জানান। শিবিরটি এমন একটি এলাকার কাছাকাছি, যেখান থেকে যুদ্ধবিরতির শর্তে সেনা সরে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখান থেকেই এখনো গুলিবর্ষণ চলছে, ফলে প্রতিদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হচ্ছে।