লেবাননে উদ্ধারকর্মীদের ওপর ইসরাইলি হামলা : নিহত ৫
Printed Edition
আলজাজিরা ও রয়টার্স
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহরের একটি ভবনে ইসরাইলের পর পর দুটি হামলায় তিন উদ্ধারকারীসহ পাঁচজন নিহত হয়েছে। মঙ্গলবারের এই ঘটনায় প্রথম হামলার পর আহতদের উদ্ধার করতে গিয়ে উদ্ধারকারীরা দ্বিতীয় হামলার শিকার হন বলে জানিয়েছে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
লেবাননের সিভিল ডিফেন্সের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মাজদাল জোউন শহরের ওই ভবনে ইসরাইলের দ্বিতীয় হামলার পর ওই তিন উদ্ধারকারী আহত অবস্থায় ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েন, পরে তাদের মৃত্যু হয়। লেবানন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইসরাইলের দ্বিতীয় হামলায় তাদের দুই সেনা আহত হয়েছে।
এ হামলার বিষয়ে মন্তব্যের জন্য তাদের জানানো অনুরোধের ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম ইসরাইলের এসব হামলার নিন্দা করে বলেছেন, ‘এ হামলা ইসরাইলের দ্বারা সংঘটিত একটি নতুন ও নির্লজ্জ যুদ্ধাপরাধ।’ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার দফতর গত মাসে বলেছে, লেবাননে স্বাস্থ্যকর্মীসহ বেসামরিকদের ওপর ইসরাইলের বিমান হামলা যুদ্ধাপরাধের সমতুল্য হতে পারে।
এ দিকে টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, মঙ্গলবার লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর ড্রোন হামলায় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বেসামরিক ঠিকাদার (৪৪) নিহত হয়েছে। এই ঠিকাদার আইতারুন এলাকায় ভারী মেশিনপত্র দিয়ে ঘরবাড়ি ধ্বংস করার সময় একটি বিস্ফোরক ভরা ফাস্র্ট-পার্সন ভিউ (এফপিভি) ড্রোন সরাসরি তার এক্সক্যাভেটরে আঘাত হানে, যেটি সেই চালাচ্ছিল। এ সময় একই কোম্পানিতে চাকরি করা তার ১৯ বছর বয়সী ছেলেও আহত হয়। এই হামলার দায় স্বীকার করে হিজবুল্লাহ জানিয়েছে, আইতারুন এলাকায় ঘরবাড়ি ভাঙায় রত একটি ইসরাইলি বুলডোজারকে ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু করেছে তারা। এ দিন হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলি বাহিনীকে লক্ষ্য করে এফপিভি ড্রোনযোগে অনেকগুলো হামলা চালিয়েছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, তাদের সেনা অবস্থানের কাছাকাছি অনেকগুলো ড্রোন বিস্ফোরিত হয়েছে আর এসব বিস্ফোরণের একটিতে এক সেনা আহত হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২ মার্চ ইসরাইলে রকেট হামলা চালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয় লেবাননের ইরানপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ। এরপর থেকে লেবাননে ব্যাপক হামলা শুরু করে ইসরাইল। তাদের হামলায় নারী ও শিশুসহ আড়াই হাজারেরও বেশি লেবাননি নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী, ২৭০ জনের বেশি নারী ও ১৭০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে চলা যুদ্ধবিরতিতে বিস্তৃত সঙ্ঘাত কমে এলেও দক্ষিণ লেবাননে সহিংসতা অব্যাহত আছে।
লেবাননের পরিবেশ বিনাশ করছে ইসরাইল
দ্যা গার্ডিয়ান জানায়, ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘ইকোসাইড’ বা ব্যাপক পরিবেশ বিনাশের অভিযোগ তুলেছেন লেবাননের পরিবেশমন্ত্রী তামারা এল জেইন। ২০২৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইসরাইলি আগ্রাসনে লেবাননের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ সম্বলিত একটি রিপোর্টের ভূমিকায় তিনি এই অভিযোগ করেন।
লেবাননের বৈজ্ঞানিক গবেষণাবিষয়ক জাতীয় কাউন্সিল (সিএনআরএস-এল) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ১০৬ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইসরাইলি সামরিক অভিযান লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ভৌত ও পরিবেশগত দৃশ্যপট পাল্টে দিয়েছে। রিপোর্টে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশমন্ত্রী তামারা এল জেইন বলেন, বনভূমি, কৃষিজমি, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও পানিসম্পদের যে ব্যাপক ও ইচ্ছাকৃত ক্ষতি করা হয়েছে, তাকে অবশ্যই ‘ইকোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এটি কেবল বাস্তুতান্ত্রিক ক্ষতি নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার ওপর বড় আঘাত।
রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি হামলায় পাঁচ হাজার হেক্টর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১১৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ভৌত কৃষিসম্পদ ধ্বংস হয়েছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতি হয়েছে আরো ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার। ৮১৪ হেক্টর জলপাইবাগানসহ মোট দুই হাজার ১৫৪ হেক্টর ফলের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, দক্ষিণ লেবানন ও পূর্ব বেকা উপত্যকার মাটিতে ফসফরাসের ঘনত্ব এক হাজার ৮৫৮ পিপিএম পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং বিষাক্ত যৌগের নির্গমনে বায়ুদূষণ চরমে পৌঁছেছে। সমালোচকদের মতে, ইসরাইল বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ‘গাজা কৌশলের’ পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। এর আগে গাজায় অভিযানের সময়ও দেশটি প্রায় ৩৮ থেকে ৪৮ শতাংশ কৃষিজমি ও বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি ধ্বংস করেছিল। লেবাননের প্রতিবেদনে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ২৫ বিলিয়ন ডলার হিসেবে প্রাক্কলন করা হয়েছে, যার মধ্যে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের জন্যই প্রয়োজন ১১ বিলিয়ন ডলার।
পরিবেশমন্ত্রী এই সঙ্কট মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সংহতি ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, তারা অভিযানের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে অবগত এবং বেসামরিক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি ন্যূনতম পর্যায়ে রাখতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করেই সব অভিযান পরিচালনা করা হয়।