নিম্নমানের বই ছেপে জরিমানার আওতায় আসছে ১৩টি প্রেস
Printed Edition
চলতি ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নিম্নমানের কাগজে পাঠ্যবই ছেপে জরিমানার আওতায় আসছে চিহ্নিত ১৩টি প্রেস। এসব প্রেসের বইয়ের নমুনা সংগ্রহ করে সেগুলোর কাগজের পুরুত্ব (জিএসএম) পরীক্ষা করে অভিযোগ আমলে নিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এখন অভিযুক্ত এসব প্রেসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে এনসিটিবি। প্রাথমিক অবস্থায় এসব প্রেসকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদেরকে অর্থদণ্ড দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে দরপত্র না মেনে নিম্নমানের পাঠ্যবই ছাপিয়েছে ১৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান (প্রেস)। প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের কাগজে প্রায় চার লাখ বই ছাপিয়েছে। এনসিটিবি সূত্র বলছে, নিম্নমানের কাগজের বই ছাপানোয় অভিযুক্ত প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে অর্থদণ্ডসহ নেয়া হবে আইনি ব্যবস্থাও। এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রাথমিক অবস্থায় পিএলআই রিপোর্টের ভিত্তিতে (পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন) অভিযুক্ত প্রেসগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী ১৪ দিনের মধ্যে বই রিপ্লেসমেন্ট বা পুনরায় বই প্রতিস্থাপন করতে হবে, না দিলে জামানতের অর্থ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ কেটে নেয়া হবে।
সূত্র আরো জানায়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে দরপত্রের স্পেসিফিকেশন (নির্ধারিত মান) অনুযায়ী পাঠ্যবই ছাপায়নি ১৩টি প্রেস। প্রেসগুলো প্রায় তিন লাখ ৯৭ হাজার ৪২১টি বই ছাপায়। এ-সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন মে মাসে এনসিটিবিতে জমা দেয় হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। বেসরকারি ওই প্রতিষ্ঠানের পিএলআই রিপোর্টে বলা হয়, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে নবম শ্রেণীর ১৯ হাজার ৫৯৫টি (রসায়ন) পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে অনুপম প্রিন্টার্স লিমিটেড, এসব বইয়ে প্রতষ্ঠানটি ৭০ জিএসএম-এর স্থানে অতি নিম্নমানের ৬১ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করেছে। আবার সপ্তম শ্রেণীর (ভোকেশনাল) ২৩ হাজার ৬৪৯টি (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়) পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে শাফিন প্রেস অ্যান্ড পাবলিকিশেনন্স, এসব বইয়ে প্রতিষ্ঠানটি ৭০ জিএসএম-এর স্থানে অতি নিম্নমানের ৫৯ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করেছে। নবম শ্রেণীর (গণিত) ২৯ হাজার ৭৫৫টি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে সুবর্ণা প্রিন্টার্স, প্রতিষ্ঠানটি ৭০ জিএসএম-এর স্থানে অতি নিম্নমানের ৫৫ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করে এবং দাখিল ষষ্ঠ শ্রেণীর (আকাইদ ও ফিকাহ) ৪৯ হাজার ৬৬২টি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করে অ্যারিস্টোক্র্যাটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং লিমিটেড, প্রেসটি ৭০ জিএসএম-এর স্থানে অতি নিম্নমানের ৫৬ জিএসএম কাগজ ব্যবহার করে।
এভাবে ইবতেদায়ি দৃতীয় শ্রেণীর (আদদুরূসুল আরাবিয়্যাহ) ৪১ হাজার ৩৮০টি, চতুর্থ শ্রেণীর (বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়) ৭৪ হাজার ৩২৭টি ও প্রথম শ্রেণীর (আদদুরূসুল আরাবিয়্যাহ) ৪৩ হাজার ৬০৭টি নিম্নমানের বই সরবরাহ করে লেটার এন কালার লি.; নবম শ্রেণীর (ব্যবসা উদ্যোগ) ৯ হাজার ৫০০টি নিম্নমানের পাঠ্যবই সরবরাহ করে বর্ণমালা প্রেস; ভোকেশনাল নবম শ্রেণীর (ফুড প্রসেসিং অ্যান্ড প্রিজারভেশন-১) ২১ হাজার ৬৭টি নিম্নমানের বই সরবরাহ করে রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন্স।
এ ছাড়াও দাখিল নবম শ্রেণীর (গণিত) ১৪ হাজার ৫১৫টি নিম্নমানের বই সরবরাহ করে ন্যাশনাল প্রিন্টিং প্রেস; নবম শ্রেণীর (জীববিজ্ঞান) ৩৪ হাজার ৬৫০টি বই ছাপায় বর্ণমালা প্রেস; দাখিল দশম শ্রেণীর (ভোকেশনাল) পাঁচ হাজার ৩৮টি নিম্নমানের বই ছাপায় দোয়েল প্রিন্টার্স; চতুর্থ শ্রেণীর (কুরআন মাজিদ ও তাজবীদ) ৩০ হাজার ৬৭৬টি বই ছাপায় দি গুডলাক প্রিন্টার্স। প্রসঙ্গত, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৪০ কোটি পাঠ্যবই সরবরাহ করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ নিম্নমানের কাগজে বই ছাপানো হয় বলে জানায় হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিস।
অপর দিকে হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসের দেয়া রিপোর্টকে চ্যালেঞ্জ করেছেন বেশ কয়েকজন প্রেস মালিক। তারা এনসিটিবিতে লিখিত আবেদন করে পিএলআই রিপোর্ট পুনঃনিরীক্ষার দাবিও জানিয়েছেন। এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, এ বিষয়েও একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাত সদস্যের এই কমিটিকে প্রথমে পাঁচ দিন সময়ে বেঁধে দেয়া হলেও গত বৃহস্পতিবার এই কমিটি সময় বর্ধিত করার জন্য আরো সময় চেয়েছে। আশা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহেই এই কমিটি তাদের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গভাবে এনসিটিবিতে দাখিল করতে সমর্থ হবে।