দেশের বড় ঈদজামাত এবারো শোলাকিয়ায়, প্রস্তুতি সম্পন্ন
Printed Edition
মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ
দেশের সবচেয়ে বড় ঈদজামাত অনুষ্ঠিত হবে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে। সকাল ১০টায় জামাত শুরু হবে। ঐতিহ্য অনুযায়ী, জামাত শুরুর আগে পরপর তিনবার ফাঁকা গুলি ছোড়া হবে। এবার শোলাকিয়ায় ২০০তম ঈদজামাত অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে ইমামতি করবেন মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ।
ঈদজামাতকে কেন্দ্র করে কিশোরগঞ্জে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ঈদের দিন ঈদগাহে প্রবেশের প্রতিটি পথে তল্লাশি চৌকি বসানো হবে। মোতায়েন থাকবে বিপুলসংখ্যক র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্য। পাশাপাশি সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। সেনাবাহিনীর টহলও থাকবে। নিরাপত্তা জোরদারে ঈদগাহ মাঠে স্থাপন করা হয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার। এ ছাড়া ঈদজামাতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চারটি ড্রোনে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে। তিনটি আর্চওয়ের মাধ্যমে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে তল্লাশি করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করানো হবে। ঈদগাহে মুসল্লিরা শুধু জায়নামাজ ও জরুরি প্রয়োজনে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। ছাতা, ব্যাগ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক সামগ্রী বহন নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে ঈদগাহ মাঠ পরিষ্কার করা হয়েছে এবং সারির দাগ কাটা হয়েছে। স্থায়ী অজুখানার পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে অতিরিক্ত অজুখানা। সুপেয় পানির জন্য মাঠের বিভিন্ন স্থানে টিউবওয়েল ও পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজন মেটাতে রাখা হয়েছে পর্যাপ্ত অস্থায়ী টয়লেট।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস’ নামে দু’টি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়েছে। জেলা শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপন করা হয়েছে শৈল্পিক তোরণ।
গতকাল মঙ্গলবার নয়া দিগন্তকে এসব জানান ঈদগাহ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন।
জেলা প্রশাসক আসলাম মোল্লা জানান, দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা ঈদের নামাজ আদায়ের জন্য শোলাকিয়ায় আসেন। যারা এক থেকে দুই দিন আগে আসেন, তাদের জন্য তিনটি স্থানে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে- আজিমউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়, শোলাকিয়া কুমুদিনী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাগে জান্নাত নূরানি মাদরাসা। তাদের জন্য বিনামূল্যে ইফতার ও খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
পুলিশ সুপার ড. এস এম ফরহাদ হোসেন বলেন, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
প্রায় এক হাজার ১০০ পুলিশ সদস্য ইউনিফর্ম ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। গোয়েন্দা নজরদারি রমজানের শুরু থেকেই জোরদার করা হয়েছে। পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে এবং বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট থাকবে।
মুসল্লিদের নিরাপত্তায় র্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন। এ বিষয়ে র্যাব-১৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নয়মুল হাসান জানান, নাশকতা প্রতিরোধে র্যাব সদস্যরা পোশাক ও সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবেন। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হবে। ওয়াচ টাওয়ার, ড্রোন ও বাইনোকুলারের মাধ্যমে নজরদারি চালানো হবে। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে টহল জোরদার করা হবে এবং ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ রেলস্টেশনেও র্যাব মোতায়েন থাকবে।
স্পেশাল ট্রেন সম্পর্কে তিনি জানান, ‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-১’ ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল ৮টায় এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা ২টায় ভৈরব পৌঁছাবে।
‘শোলাকিয়া এক্সপ্রেস-২’ ময়মনসিংহ থেকে সকাল পৌনে ৬টায় ছেড়ে কিশোরগঞ্জ পৌঁছাবে সকাল সাড়ে ৮টায় এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জ থেকে ছেড়ে বেলা ৩টায় ময়মনসিংহ পৌঁছাবে।
অন্যদিকে, শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠকে ঘিরে রয়েছে নানা জনশ্রুতি। এক মতে, মুঘল আমলে এ এলাকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল ‘শ লাখ’ টাকা (অর্থাৎ এক কোটি টাকা), যা থেকে ‘শোলাকিয়া’ নামের উৎপত্তি। অন্য জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৮২৮ সালে এখানে সোয়া লাখ মুসল্লি একসাথে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকেই এটি ‘শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ’ নামে পরিচিতি পায়।
উল্লেখ্য, প্রায় ১৫ বছর পর গতবছর শোলাকিয়া ঈদগাহের স্থায়ী ইমাম হিসেবে পুনর্বহাল করা হয়েছে মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে। এ বছর ইদগাহ কমিটির সভায় তা রেজুলেশন করা হয়।
মুফতি আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ ২০০৪ সাল থেকে ঈদগাহ কমিটি ও মোতাওয়াল্লির নিয়োগে স্থায়ী ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে সরিয়ে দিয়ে বিতর্কিত মাওলানা ফরীদ উদদীন মাসউদকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ থাকায় তাকে অবৈধভাবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। সে সময় ওয়াকফ দলিলের শর্ত এবং মোতাওয়াল্লির মত অগ্রাহ্য করে বৈধ ইমাম ছাইফুল্লাহকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল।
এ ঘটনায় স্থানীয় মুসল্লিদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং ঈদগাহের ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঈদগাহে মুসল্লির সংখ্যা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ফরীদ উদদীন মাসউদ জনরোষের ভয়ে আত্মগোপন করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহকে ইমাম হিসেবে পুনর্বহালের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
মুফতি ছাইফুল্লাহর পুনর্বহালের ফলে গত বছর ঈদজামাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় লক্ষাধিক মুসল্লির উপস্থিতি বেশি ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। এবারও রেকর্ড সংখ্যক মুসল্লি ঈদজামাতে অংশগ্রহণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।