ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

কে পাচ্ছে বরিশাল সদর, জামায়াত নাকি ইসলামী আন্দোলন

Printed Edition
bangla-3
মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, সৈয়দ ফয়জুল করিম

আযাদ আলাউদ্দীন বরিশাল ব্যুরো

১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের পক্ষ থেকে কে হচ্ছেন বরিশাল-৫ সদর আসনের প্রার্থী- এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি। যদিও বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আসনে রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বরিশাল অঞ্চল পরিচালক অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল এবং ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম।

এই দুই প্রার্থীই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল সদর আসনে বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো: মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হতে চাইছেন। শেষ পর্যন্ত অ্যাডভোকেট হেলাল এবং মুফতি ফয়জুল- এই দুইজনের মধ্যে কে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হবেন, সেটা নিয়ে বরিশালের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা শোনা যাচ্ছে।

জানা যায়, ১১ দলের হয়ে প্রার্থিতার প্রশ্নে জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট হেলাল কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কিছুটা নীরব থাকলেও ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করিম অনড় রয়েছেন। বরিশাল সদর আসনে তিনি জোটের তরফে মনোনয়নবঞ্চিত হলে ইসলামিক দলগুলোর বলয় থেকে বের হয়ে আসার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বরিশালের এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলার ২১টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন আসন হচ্ছে বরিশাল-৫ সদর আসনটি, যা রাজনৈতিক আঁতুরঘর হিসেবেও সমধিক পরিচিত। আলোচিত এই আসনের ওপরই নির্ভর করে গোটা দক্ষিণবঙ্গের রাজনীতি। বিএনপির বর্ষীয়ান নেতা অ্যাডভোকেট সরোয়ারের সাথে ১১ দলের প্রার্থী হয়ে বরিশাল সদর আসনে কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন- এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হয়তো আরো কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলন করে জোটের শরিক ইসলামী অন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ ফয়জুল করিম দাবি করেন, তিনি বরিশাল-৫ আসন থেকে প্রার্থী হতে চাইছেন। এ আসনটি তার আপন বড় ভাই ইসলামী আন্দোলনের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করিমের। মর্যাদাপূর্ণ এই আসন থেকে ফয়জুল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে যেন এক ধরনের দৃঢ়সঙ্কল্প নেয়া হয়েছে।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মী- অনুসারীরা বলছেন, তাদের প্রার্থী এর আগেও একাধিকার জাতীয় এবং স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সবশেষ আওয়ামী লীগের শাসনামলে ২০২৩ সালে তিনি বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের লোকজন জাল ভোট দেয়াসহ কেন্দ্র দখল করে ও নানা অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাদের প্রার্থী হামলায় রক্তাক্ত হন এবং নির্বাচন বর্জন করেন।

এ দিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, তখনকার নির্বাচন ছিল একটি অবৈধ নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার ভোট। এ আসন থেকে তখন ইসলামী আন্দোলন যে ভোট পেয়েছিল সেটি নিজ দলের একক ভোট নয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ওই নির্বাচন বর্জন করে প্রার্থী না দেয়ায়- আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে তখন সাধারণ ভোটাররা হাতপাখায় ভোট দিয়েছে। এবার যেহেতু বিএনপি-জামায়াত মাঠে আছে, সেহেতু ভোটের সমীকরণ ভিন্ন হবে।

এই আসনে ১১ দলীয় জোটের সমর্থনপ্রত্যাশী জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বরিশাল নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা এবং ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সাথে রয়েছেন। তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। পরে তিনি দীর্ঘদিন বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।

বরিশাল-৫ আসন ইস্যুতে জামায়াতের কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের অপশাসনের ১৬ বছরে দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। বিশেষ করে আওয়ামী সরকার পতনের পরে মানুষ এখন পরিবর্তন চাইছে এবং সৎ-যোগ্য, পরিচ্ছন্ন এবং মেধাসম্পন্ন নেতাকে নেতৃত্ব বুঝিয়ে দিতে ভোটাররা উদগ্রীব হয়ে আছেন। বরিশাল সদর আসনে জামায়াতের প্রার্থী অ্যাডভোকেট হেলাল জনসাধারণের কাছে আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছেন। তাকে বরিশাল-৫ আসনের মানুষ জনপ্রতিনিধি হিসেবে চাইছেন। তিনি ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হবেন এবং বিএনপির শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয়ী হতে পারবেন।

বরিশাল মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর বলেন, বিগত ১৬ বছরে বরিশাল মহানগর ও সদর উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর রুকন ও কর্মী সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচগুণ। সহযোগী সদস্য বেড়েছে প্রায় ১০০ গুণ। সবমিলিয়ে বরিশালে জামায়াতে ইসলামীর আগের চেয়ে সাংগঠনিকভাবে অনেক সুসংহত এবং গণমুখী দলে পরিণত হয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আগে বরিশাল-৫ আসনে নির্বাচন নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাইছেন না জামায়াত প্রার্থী অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল। তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকেই মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। এখন ১১ দলীয় জোটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ জানান, তাদের প্রার্থীরা ২৭২টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। চরমোনাই পীর মুফতি রেজাউল করীম নিজে প্রার্থী হননি। তবে সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম বরিশাল-৫ ও বরিশাল-৬ আসন থেকে নির্বাচন করছেন। তিনি জানান, আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা এখনো চলমান।

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বলছেন, যেহেতু দু’জনই দুইটি দলের কেন্দ্রীয় নেতা, সেহেতু বরিশাল-৫ সদর আসনে অ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এবং বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচন করলে কিছুটা ব্যালেন্স তৈরি হয়।