পাহাড়ে জটিল রূপ নিচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা সঙ্কট

নিয়োগ পেয়েও যোগ দেন না শিক্ষক

Printed Edition
bangla-1
দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় : নয়া দিগন্ত

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ, দীর্ঘ পথ, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব ও তুলনামূলক স্বল্প বেতনের কারণে রাঙ্গামাটির মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষকসঙ্কট দিন দিন জটিল আকার ধারণ করছে। জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষকই পার্বত্য এই জেলায় যোগদান করছেন না। এতে জেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে, নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার মানোন্নয়নেও।

জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ এনটিআরসিএ গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রাঙ্গামাটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হলেও তাদের একটি বড় অংশ এখনো কর্মস্থলে যোগ দেননি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়োগ পাওয়া এসব শিক্ষক পাহাড়ি অঞ্চলের দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, বাসস্থান সঙ্কট, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা এবং কম বেতনের কারণে এখানে স্থায়ীভাবে চাকরি করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন।

রাঙ্গামাটি জেলা শিক্ষা অফিসার সরিৎ কুমার চাকমা বলেন, পাহাড়ি এলাকায় কর্মপরিবেশ অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে হয়, অনেক স্থানে যোগাযোগব্যবস্থা এখনো অনুন্নত। এসব কারণে বাইরে থেকে আসা শিক্ষকরা যোগ দিতে আগ্রহ দেখান না। তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ বাড়ানো গেলে এ সঙ্কট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।

সম্প্রতি জেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়ে শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-টিআইবি আয়োজিত এক অ্যাডভোকেসি সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সনাক সভাপতি অধ্যাপক বাঞ্ছিতা চাকমা এবং সঞ্চালনা করেন টিআইবির এরিয়া কো-অর্ডিনেটর বেনজিন চাকমা। এতে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় জানানো হয়, ‘প্যাক্টা’ প্রকল্পের আওতায় টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে দুর্নীতি হ্রাস ও সেবা প্রদান কার্যক্রমে শুদ্ধাচার বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি ও পরিবেশ (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা) খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সনাক সদস্য ও শিক্ষা উপকমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক গৈরিকা চাকমা বলেন, অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপের (এসিজি) মাধ্যমে কমিউনিটি পর্যায়ে সমস্যা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

সভায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বাস্তব সমস্যার কথাও তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে নারীশিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ও নিরাপদ টয়লেটের অভাব, অনেক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক চিকিৎসাসুবিধা না থাকা এবং নারী-বান্ধব পরিবেশের ঘাটতির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এসব সমস্যা দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানানো হয়।

এ ছাড়া এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল উন্নয়নে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়। ক্লাস রুটিনে ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের ক্লাস প্রথমার্ধে রাখা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে নিয়মিত হোম ভিজিট বা ফোনে যোগাযোগ চালু রাখা এবং এসব তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়।

শিক্ষকসঙ্কট নিরসনে সভায় এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্বত্য অঞ্চলের পদগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সংরক্ষণের দাবি জোরালোভাবে তোলা হয়। বক্তারা বলেন, স্থানীয় শিক্ষকরা এলাকার ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিবেশের সাথে পরিচিত হওয়ায় তারা দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে আগ্রহী হন এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

সভায় আরো আলোচনা হয় বিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়ন নিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। পাশাপাশি কাপ্তাই হ্রদের দূষণ রোধ, প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইভটিজিং প্রতিরোধেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়।

সভায় জেলা শিক্ষা অফিসার তার আওতাধীন সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধানের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, শিক্ষকসঙ্কট নিরসনসহ শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে আরো আন্তরিকতার সাথে কাজ করতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক বাঞ্ছিতা চাকমা বলেন, সনাক তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করার মাধ্যমে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে কাজ করছে। প্যাক্টা প্রকল্পের আওতায় অ্যাকটিভ সিটিজেন গ্রুপের কার্যক্রম শিক্ষার মানোন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি মনে করেন।