একাধিক ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

জুলাই সনদ, গণভোটসহ কয়েকটি ইস্যুতে রাজনৈতিক চাপে পড়তে যাচ্ছে বিএনপি। এমনটিই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, নির্বাচনে নানা অনিয়মের অভিযোগ ছাড়াও সরকার গঠন পরবর্তীতে জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে সরকারি দল বিএনপির সামনের সময়টা যে সহজ হবে, সেটি ভাবা ঠিক হবে না। এ ছাড়াও দলের ভেতরে পাওয়া না পাওয়ার অসন্তোষ, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সক্রিয়তা ও নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে চাপে থাকবে দলটি।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির সামনে সময়টা সহজ হবে না। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, দলের ভেতরের অসন্তোষ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমীকরণ, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য ও বিরোধী শক্তির সক্রিয়তা, বিভিন্ন দাবিতে রাজপথ সরব থাকা, তীব্র যানজট, ঢাকায় মশার উপদ্রব, সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে দলটিকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে এক দিকে যেমন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে হবে, অন্য দিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও আন্তর্জাতিক শক্তির বিভিন্ন হিসাব-নিকাশও মোকাবেলা করতে হবে। ফলে ক্ষমতায় থেকেও বিএনপির সামনে নানা ধরনের চাপ তৈরি হতে থাকবে।

সূত্র মতে, দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক নতুন ধারা ও সংস্কৃতির আভাস দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষ। ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সরকার ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকারপ্রধানের নানা উদ্যোগ দেশবাসীর কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে; যা দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে কিছুটা ভিন্ন বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে শাসনব্যবস্থায় সরলতা, দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বাড়ানোর যে চেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির।

অনেকেই বলছেন, দেশের রাজনীতিতে এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যেখানে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এমনকি উচ্চপর্যায়ের নেতারাও সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করার চেষ্টা করছেন। এ পরিবর্তনকে অনেকেই ‘নতুন ধারার রাজনীতি’ হিসেবে দেখছেন। অতীতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে শুরুতেই দুর্নীতি, বিলাসিতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। ফলে সাধারণ মানুষ সেই সময় অনেকটা বিরক্ত ও হতাশ ছিল। তবে বর্তমানে কিছু ঘটনাকে ঘিরে ভিন্ন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এই পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে দীর্ঘমেয়াদে এসব উদ্যোগ কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তার ওপর।

এ দিকে সরকার শুরুতেই জনবান্ধব নানা উদ্যোগ নিলেও মন্ত্রিসভা গঠনের পর সরকারি দল বিএনপির ভেতরেই কিছুটা অসন্তোষের সুর শোনা গেছে। অনেকেই বলেছেন, জীবনে আর মন্ত্রিত্ব নেবো না। সংসদ সদস্য হিসেবেই জনগণের সেবা করতে চাই। অনেকেই আবার ভবিষ্যতে রাজপথে সরব না থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। সূত্রের দাবি, প্রায় দুই ডজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা অভিমানে নীরব হয়ে পড়েছেন। তারা প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া না দিলেও ঘনিষ্ঠ মহলে অসন্তোষের কথা জানিয়েছেন। অনেকেই আগের মতো সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছেন না। অনেকেই বলেছেন, মন্ত্রিত্ব পাইনি দুঃখ নেই, তবে অন্তত মতামত তো নিতে পারত!

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে থাকা নেতাদের মধ্যে এ ধরনের অসন্তোষ তৈরি হলে তা দলীয় ঐক্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর সাথে দলের পরিচয়ে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, দখলসহ অন্যান্য অনিয়মের দায়ভারও নিতে হবে দলটিকে। অবমূল্যায়িত হওয়া নেতারা এসব কর্মকাণ্ডের প্রচারণায় মূখ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ দিকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলাম, এনসিপিসহ সরকার বিরোধীরা। তাদের এ অভিযোগের মাত্রা আরো বেড়ে গেছে সাবেক এক উপদেষ্টার বক্তব্যের পর। তারা বলছেন, নির্বাচন সঠিকভাবে হয়ে যাওয়ার পর ভোট গণনার সময় অনিয়ম করা হয়েছে। ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট পদক্ষেপ কামনা করেছে তারা।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, এই নির্বাচন ছিল জনগণের বহুল প্রত্যাশিত। ভোটের প্রতি দেশবাসীর আস্থা তৈরি হয়েছিল, কিন্তু ভয়াবহ কারচুপির মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদের আশাহত করা হয়েছে। জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এনসিপির শীর্ষ নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক আসনে ভোট ডাকাতি করা হয়েছে। এটি জনগণ মেনে নেবে না। বেশ কিছু নির্বাচনী এলাকায় ভোট আবার গণনা করতে হবে। সুপরিকল্পিতভাবে যে ফল পরিবর্তন করা হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা অধিকার আদায় করতে জানি। ফল পাল্টে দেয়ার এ চক্রান্ত সফল হবে না।

এ ছাড়া জুলাই সনদ ও গণভোটে ইস্যুতে আবারো সরব হয়ে উঠছে রাজনৈতিক অঙ্গন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে ব্যবস্থা না নিলে রাজপথে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য। ২৮ মার্চ শীর্ষ নেতাদের সাথে বৈঠক করে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি ও তা ঘোষণা করা হবে।

১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির নেতা, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের সাথে জুলাই সনদ আদেশের ওপর গণভোট হয়েছে। এতে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। আরেকটা সংসদ গঠনের ভোট। একই দিনে দু’টি ভোট, ফল প্রকাশ ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখন সরকারি দল গণভোট মানতে চাইছে না। তিনি বলেন, বিএনপি গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে কথা বললো কিন্তু বাস্তবে ইউটার্ন নিয়েছে এবং জনগণের সাথে প্রতারণা করেছেন।

জুলাই সনদ ও গণভোট ইস্যুতে চলমান সঙ্কটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরেই হোক- এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে সমাধান না হলে আন্দোলনে রাজপথে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সংসদে গণভোটের ফলাফল মানা হবে কি না, সেটি জানতে চাওয়া হয়েছে। পয়েন্ট অব অর্ডারে এসব বিষয় উত্থাপন করলে স্পিকার জানিয়েছেন, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নোটিশ দিলে তা বিবেচনা করে আলোচনা করা হবে। সেই অনুযায়ী বিরোধী দল নোটিশ দিয়ে সংসদের ভেতরেই সমস্যার সমাধান চাওয়ার উদ্যোগ নেবে। যদি সংসদের ভেতরে জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন না ঘটে, তবে স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে নামতে হবে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বিরোধিতা, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ, কূটনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাসহ একাধিক চ্যালেঞ্জ বিএনপির সামনে একসাথে উপস্থিত হয়েছে। সব কিছু বিবেচনায় নিয়ে দলটিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোতে হবে। জানা গেছে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে। এর মধ্যে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইতোমধ্যেই দলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত রাখা ও সরকার হিসেবে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেও নজর রাখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিটি পদক্ষেপ যদি সুপরিকল্পিতভাবে নেয়া না হয়, তা হলে তা ভবিষ্যতে সরকার ও দলের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াতে পারে।