শেষ দিনে মনোনয়নপত্র জমার হিড়িক, আজ শুরু বাছাই

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • দলগুলো এখনো ব্যস্ত নির্বাচনী জোট গঠনে
  • ৩০০ আসনে সাড়ে ৩ হাজার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ
  • ঢাকা-১৫ আসনে ডা: শফিক, ১৭ আসনে তারেক রহমান
  • বগুড়া-৭ আসনে খালেদা জিয়া ও ঠাকুরগাঁও-১ এ মির্জা ফখরুল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিল শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। গতকাল সোমবার শেষ দিন হওয়ায় অধিকাংশ আসনেই মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার প্রবণতা বেশি ছিল। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, ৩০০ সংসদীয় আসনের বিপরীতে সারা দেশে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। মনোনয়ন দাখিলের সময় বাড়ানো নিয়ে কয়েক দিন ধরে গুজব থাকলেও শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়, সময় বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ফলে নির্ধারিত সময়েই মনোনয়ন জমা কার্যক্রম শেষ হয়।

ইসি সচিবালয় জানিয়েছে, দাখিল করা মনোনয়নপত্রের বাছাই শুরু হচ্ছে আজ ৩০ ডিসেম্বর থেকে, যা চলবে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সম্পদ বিবরণী, আয়কর সংক্রান্ত তথ্য এবং আইনগত যোগ্যতা যাচাই করা হবে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করেই বাছাই কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

এবারের নির্বাচনে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দল ও জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে জোট গঠন ও আসন সমঝোতা নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আলোচনা চলে। সংসদ সদস্য হওয়ার আশায় এবং বড় দলের প্রতীক পাওয়ার লক্ষ্যে কয়েকটি ছোট দলের শীর্ষ নেতা নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বড় জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। প্রার্থীরা বলছেন, মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে- এখন সুষ্ঠু নির্বাচন, ভোটারদের নিরাপত্তা এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের।

ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ ও প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে।

নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে ২২ জানুয়ারি এবং চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। সারা দেশে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের জন্য ৬৯ জন রিটার্নিং অফিসার ও ৪৯৯ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োজিত রয়েছেন।

এ দিকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে শেষ দিনে মনোনয়ন জমা নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ছিল বলে জানিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা। ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৫ আসনে মোট ২০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। রিটার্নিং অফিসার মো: ইউনূচ আলী জানান, ঢাকা-১৩ আসনে ১১ জন এবং ঢাকা-১৫ আসনে ৯ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। ঢাকা-১৫ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমানের পক্ষে দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলরা মনোনয়নপত্র জমা দেন। বিএনপির পক্ষ থেকে একই আসনে প্রার্থী হয়েছেন শফিকুল ইসলাম খান মিলটন। ঢাকা-১৩ আসনে বিএনপি জোটের হয়ে এনডিএম থেকে পদত্যাগ করে মনোনয়ন জমা দেন ববি হাজ্জাজ। একই আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে মুফতি মুমিনুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার মুরাদ হোসেন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন।

ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটার্নিং অফিসার শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীর কাছে। তার নির্বাচনী এজেন্ট আবদুস সালাম বলেন, জনগণের সমর্থন পেলে তারেক রহমান এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে দেশের সঙ্কট উত্তরণে ভূমিকা রাখবেন। তিনি জানান, তারেক রহমান এর আগে এই এলাকার ভোটার ছিলেন এবং এলাকাটির সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়েও মনোনয়ন জমাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঠাকুরগাঁওয়ের তিনটি সংসদীয় আসনে মোট ২১ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন জেলা প্রতিনিধি। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মনোনয়ন জমা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ দিন পর দেশের মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। একই আসনে জামায়াতের দেলাওয়ার হোসেন ও ইসলামী আন্দোলনের খাদেমুল ইসলাম মনোনয়ন জমা দেন। ঠাকুরগাঁও-২ ও ঠাকুরগাঁও-৩ আসনে বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, সিপিবিসহ একাধিক দলের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। স্থানীয় ভোটারদের মতে, এই জেলায় মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের মধ্যে।

বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়া জেলার সাতটি আসনেই শেষ দিনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে বগুড়া-৭ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে একই আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবেও মনোনয়ন দাখিল করা হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ আসনে এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা শাহাবুদ্দিনসহ একাধিক প্রার্থী জেলার বিভিন্ন আসনে মনোনয়ন জমা দেন। মনোনয়ন জমাদানকালে দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেবেন। একই আসনে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন এবং একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীও মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, ফলে এখানে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে।

সিলেট ব্যুরোর পাঠানো তথ্য অনুসারে, সিলেট জেলায় ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দলীয় সূত্র জানায়, সিলেট-২ ও সিলেট-৪ আসনে শরিক দলগুলোর জন্য ছাড় দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। সিলেট-১, ৩, ৪, ৫ ও ৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা জেলা রিটার্নিং অফিসারের কাছে মনোনয়ন দাখিল করেন। মনোনয়ন জমার আগে প্রার্থীরা নগরীতে দোয়া মাহফিলে অংশ নেন। জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন, সিলেটের আসনগুলোতে ১০ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মাঠে কাজ করবেন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীর চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীরা উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম-১১ আসনে বিএনপি প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিজ নির্বাচনী কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। মনোনয়নপত্র জমাদানের সময় সমর্থকদের সাথে পুলিশের সংক্ষিপ্ত ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা একটাই, গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া। চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-৮ আসনে এরশাদ উল্লাহ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

একইভাবে জামায়াত প্রার্থীরা চট্টগ্রাম-৮, ৯, ১০ ও ১১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। চট্টগ্রাম-৯ আসনে ডা: এ কে এম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম-৮ আসনে ডা: আবু নাসের, চট্টগ্রাম-১০ আসনে অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী এবং চট্টগ্রাম-১১ আসনে শফিউল আলম মনোনয়নপত্র জমা দেন। তারা সবাই বলেছেন, নির্বাচিত হলে ন্যায়, ইনসাফ ও উন্নয়নের রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় কাজ করবেন।

চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনে মোট ১৪৩ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম-১ মীরসরাইতে ১০ জন, চট্টগ্রাম-২ ফটিকছড়িতে ৯ জন, চট্টগ্রাম-৩ সন্দ্বীপে ৫ জন, চট্টগ্রাম-৪ সীতাকুণ্ডে ১০ জন, চট্টগ্রাম-৫ হাটহাজারীতে ১০ জন, চট্টগ্রাম-৬ রাউজানে ৫ জন, চট্টগ্রাম-৭ রাঙ্গুনিয়ায় ৯ জন, চট্টগ্রাম-৮ বোয়ালখালী-চান্দগাঁও ৯ জন, চট্টগ্রাম-৯ কোতোয়ালি-বাকলিয়ায় ১২ জন, চট্টগ্রাম-১০ ডবলমুরিং-পাহাড়তলী-খুলসীতে ১১ জন, চট্টগ্রাম-১১ বন্দর-পতেঙ্গা ১২ জন, চট্টগ্রাম-১২ পটিয়ায় ১১ জন, চট্টগ্রাম-১৩ আনোয়ারায় ৯ জন, চট্টগ্রাম-১৪ চন্দনাইশে ৯ জন, চট্টগ্রাম-১৫ সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় ৩ জন এবং চট্টগ্রাম-১৬ বাঁশখালীতে ৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

খুলনা ব্যুরোর পাঠানো তথ্য অনুসারে, খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৫৪টি মনোনয়নপত্র উত্তোলন করা হয়েছে, যা ৪৬টি জমা পড়েছে। খুলনা-১ আসনে ১৩টি, খুলনা-২ ৪টি, খুলনা-৩ ১২টি, খুলনা-৪ ৫টি, খুলনা-৫ ৬টি এবং খুলনা-৬ ৬টি মনোনয়নপত্র জমা হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, জাতীয় পার্টি, খেলাফত মজলিস, সিপিবি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

সার্বিকভাবে শেষ দিনে মনোনয়ন জমার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এখন প্রার্থীরা বাছাই প্রক্রিয়া, চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ও নির্বাচনী পরিবেশের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষতা, নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দক্ষতা বজায় রাখতে পারে, তবে এবারের নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।