ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে উপহাস
ফের হামলা হলে কঠিন আঘাতের হুমকি ইরানের
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র আবারো হামলা শুরু করলে মার্কিন অবস্থানে দীর্ঘমেয়াদি ও যন্ত্রণাদায়ক পাল্টা আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল বৃহস্পতিবার ইরানের এই কড়া বার্তার ফলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের মার্কিন পরিকল্পনা আরো জটিল হয়ে পড়েছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছে। বর্তমানে ৮ এপ্রিল থেকে একটি যুদ্ধবিরতি চললেও হরমুজ প্রণালী এখনো অবরুদ্ধ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি বন্ধ থাকায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারেও পৌঁছে যায়, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। এর ফলে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা তীব্র হচ্ছে।
গতকাল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ জানিয়েছে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দেশটিকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় করতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছেন। এমনকি হরমুজ প্রণালী দখল করে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এটি উন্মুক্ত করার একটি পরিকল্পনাও ট্রাম্পের টেবিলে রয়েছে। এ েেত্র স্থল সৈন্য ব্যবহারের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।
এ দিকে মার্কিন তৎপরতার মধ্যে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার মাজিদ মৌসাভি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, আমরা দেখেছি আপনাদের আঞ্চলিক ঘাঁটিগুলোর কী অবস্থা হয়েছে। এখন আপনাদের যুদ্ধজাহাজগুলোর েেত্রও একই পরিণতি হবে। ইরান এরই মধ্যে ইসরাইল ও আরব আমিরাতের মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও পেণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এমনকি ‘আমাজন’ জানিয়েছে, বাহরাইন ও আরব আমিরাতে তাদের কাউড সার্ভিস অঞ্চলগুলো তিগ্রস্ত হয়েছে, যা পুনরুদ্ধার করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কনস্ট্রাক্ট’ নামে একটি নতুন জোট গঠনের চেষ্টা করছে। তবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো দেশগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা এই জোটে যোগ দিতে আগ্রহী নয়। এ দিকে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি সমঝোতার চেষ্টা চললেও তা থমকে আছে। ইরান চায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনা করতে, কিন্তু ট্রাম্পের দাবিÑ আলোচনার শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যু সমাধান করতে হবে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ ইরানকে সময়পেণ বন্ধ করতে বলেছেন। অন্য দিকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সাথে কথা বলে জাপানি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। সব মিলিয়ে, এক দিকে যুদ্ধের দামামা আর অন্য দিকে তেলের বাজারের অস্থিরতা বিশ্ববাসীকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই নৌপথের ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এখন দেখার বিষয়, ট্রাম্পের পরবর্তী পদপে মধ্যপ্রাচ্যকে শান্তি না কি এক মহাযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায়।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার
ইরান যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই হাজার ৫০০ কোটি (২৫ বিলিয়ন) ডলার খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিরা সদর দফতর পেন্টাগনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর এটিই মার্কিন সামরিক ব্যয়ের প্রথম কোনো সরকারি হিসাব। বুধবার হাউজ আর্মড সার্ভিসেস কমিটির শুনানিতে পেন্টাগনের অর্থ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা জুলস হার্স্ট জানান, এই খরচের বেশির ভাগই হয়েছে গোলাবারুদ বা সমরাস্ত্রের পেছনে।
তবে এই হিসাবের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে তিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর অবকাঠামো মেরামত বা পুনর্গঠন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি হার্স্ট।
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে ইরান যুদ্ধের এই বিশাল ব্যয়ের হিসাব সামনে এলো। জনমত জরিপগুলোতে বর্তমানে ডেমোক্র্যাটরা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তারা যুদ্ধের ব্যয়বহুল প্রভাবকে সামনে এনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের রিপাবলিকানদের চাপে ফেলার চেষ্টা করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বিঘিœত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে হু হু করে বাড়ছে পেট্রল ও গ্যাসলিনের দাম। এর প্রভাব পড়েছে সারসহ কৃষি পণ্যের ওপরও, যা সাধারণ ভোক্তাদের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৩৪ শতাংশ আমেরিকান এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা মার্চের তুলনায় ৪ শতাংশ কম।
পেন্টাগন বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত ১০ হাজার সেনা মোতায়েন রেখেছে এবং ওই অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরী অবস্থান করছে। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েক শ’ আহত হয়েছেন। বর্তমানে দু’পরে মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও ওই অঞ্চলে উত্তেজনা এখনো কাটেনি।
ইরান যুদ্ধকে চোরাবালি বললেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা
ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ‘কৌশলগত দিকনির্দেশনা’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে এই যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘গুরুতর আত্মঘাতী ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য জন গারামেন্ডি। তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধের ‘চোরাবালিতে’ আটকে গেছেন।
হেগসেথকে ল্য করে এই ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য বলেন, ‘আপনি ও প্রেসিডেন্ট, উভয়ই প্রথম দিন থেকেই এই যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার জনগণের কাছে মিথ্যা বলে আসছেন।’
গারামেন্ডি এই যুদ্ধ কৌশলকে ‘চরম অযোগ্যতা’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, তেহরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট আছে, এমনকি ইরানের পেণাস্ত্র ও ড্রোনব্যবস্থাও ধ্বংস করা যায়নি। উল্টো এই যুদ্ধ চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সাথে ইরানের সমন্বয়কে আরো শক্তিশালী করেছে। ইরান যুদ্ধের খরচ মেটাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর বাজেট বাড়িয়ে এক দশমিক পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার করার প্রস্তাব করেছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে ইরানের উপহাস
ইরানের তেল রফতানি বন্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত নৌ-অবরোধ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেয়া ভবিষ্যদ্বাণীকে সরাসরি উপহাস করেছে তেহরান। ওয়াশিংটনের এ কৌশলকে ‘ব্যর্থ’ আখ্যা দিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ। একই সাথে মার্কিন প্রশাসনের ভুল নীতির কারণেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলেও দাবি করেছেন ইরানি স্পিকার।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এরই মধ্যেই ১২০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং যা পরে ১৪০ ডলারে পৌঁছাবে বলেও দাবি করেন গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক ব্যঙ্গাত্মক পোস্টে গালিবাফ লিখেন, ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তিন দিন পার হলো। কিন্তু ইরানের কোনো তেলকূপ এখনো ‘বিস্ফোরিত’ হয়নি। একটি কূপও ফাটেনি। আমরা চাইলে এই সময়সীমা ৩০ দিন পর্যন্ত বাড়িয়ে এখান থেকে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করতে পারি।
গত ২৬ এপ্রিল ট্রাম্প এক পোস্টে দাবি করেছিলেন যে, তিন দিনের মধ্যে ইরানের তেলকূপগুলো এক বিধ্বংসী প্রক্রিয়ায় বিস্ফোরিত হতে শুরু করবে। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর গালিবাফ বিদ্রƒপ করে এমন মন্তব্য করে পোস্টে।