ঢাকার ধোঁয়া ও দূষণ কমাতে নানা উদ্যোগ, নামানো হবে বৈদ্যুতিক বাস
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার ধোঁয়া ও নানা ধরনের দূষণ কমাতে সরকার বিভিন্ন নীতি ও পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় উদ্যোগটি হলো ঢাকায় নামানো হবে বৈদ্যুতিক বাস, এতে ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৪ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত ন্যাশনাল এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান (এনএকিউএমপি)। এই পরিকল্পনার আলোকে কয়েকটি প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ঢাকার দূষণ কমাতে। এই পরিকল্পনার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগগুলো হলো- ঢাকাসহ সারা দেশে পিএম ২.৫ কণার মাত্রা কমানো; বায়ুর মান ভালো বা মাঝারি থাকা দিনের সংখ্যা বাড়ানো এবং দূষণকারী যানবাহন, নির্মাণকাজ, ইটভাটা নিয়ন্ত্রণ করা। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী সরকার কিছু অর্থনৈতিক ও নীতিগত পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যানবাহনের জন্য এমিশান (দূষণ নির্গমন) ট্যাক্স আরোপ করা, কার্বন ট্যাক্স, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে কর ছাড় এবং দূষণকারী শিল্পের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বছরে দুই হাজার ৭৩৪ টন পিএম ২.৫ ফাইন পার্টিকল নির্গমন করে। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত গাইড লাইনের চেয়ে ১৮ গুণ বেশি। এটা মানুষের নানা ধরনের ক্ষতি করে থাকে। বছরে এক লাখ ৫৯ হাজার অকালমৃত্যুর জন্য এই ফাইন পার্টিকল দায়ী। ফাইন পার্টিকল পিএম ২.৫ খুবই বিপজ্জনক। গত ৯ বছরে মাত্র ৩১ দিন পরিষ্কার বাতাস পাওয়া গেছে। ২০২৬ সালেও ঢাকার একিআই অনেকসময় ২০০-এর বেশি, এটাকে খুবই অস্বাস্থ্যকর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
পরিবেশ অধিদফতরের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার বাতাসের মান ধীরে ধীরে উন্নত হবে, তা সত্ত্বেও তাৎক্ষণিক উন্নতি সম্ভব নয়। তারা বলছেন, এতে কয়েক বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে সরকার কর্তৃক ধুলো নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা ও নির্মাণস্থলে পানি ছিটানো; খোলা মাটি ঢেকে রাখা; নির্মাণস্থলে ফেন্সিং ও কাভারিং বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে; কিন্তু এই ব্যবস্থাগুলোর অন্যতম হলো- জিরো সয়েল পলিসি বা খোলা মাটি না রাখা।
ধোঁয়া ও নির্গমন হ্রাস করতে যানবাহনের দূষণ কমানো, পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরানো, নতুন পরিবেশবান্ধব বাস যুক্ত করা, প্রচলিত ইটের পরিবর্তে কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের উৎসাহ প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদফতর অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে মাঝে মাঝে কিছু অভিযান পরিচালনা করে থাকে; কিন্তু এগুলো যেমন যথাযথ নয় আবার পর্যাপ্ত নয়। আবার পরিবেশ অধিদফতরের অভিযানে ধারাবাহিকতা থাকে না। একবার অভিযান করে গেলে সেখানে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দ্বিতীয়বার আর আসা হয় না। এই সুযোগটিই নিয়ে থাকে পরিবেশদূষণের সাথে জড়িতরা।
পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছু বিধিমালা রয়েছে সেগুলো বাস্তায়নের কথা বললেও কিভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটিই পরিষ্কার না। চার দিকে যেভাবে বায়ুদূষণের মহোৎসব চলছে, কেউ এই ব্যাপারটি আমলেই নিতে চায় না দেখে ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন।
বায়ুদূষণ কমিয়ে আনতে সরকার বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় প্রায় ২৯০ মিলিয়ন ডলারের ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। খুব শিগগিরই ঢাকায় কিছু দৃশ্যমান উন্নয়নও দেখা যাবে। ঢাকার বায়ুমান উন্নত করতে খুব শিগগিরই ৪০০ বৈদ্যুতিক গাড়ি আমদানি করা হবে যেটা কোনো ধরনের দূষণ নির্গমন করবে না। ৪০০ বৈদ্যুতিক বাস নামালে ডিজেল-চালিত বায়ুদূষণকারী বাসগুলো তুলে নেয়া হবে। বৈদ্যুতিক বাস নামানোর আগেই সেই টাকায় বাসের ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য চার্জিং ডিপো তৈরি করা হবে। একই সাথে পাঁচটি নতুন গাড়ি পরিদর্শন সেন্টার নির্মাণ করা হবে। এতে বায়ু পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করা হবে।
সরকার বায়ুদূষণ কমাতে নীতি, অভিযান ও আন্তর্জাতিক প্রকল্প চালু করতে চাচ্ছে; কিন্তু গবেষকরা বলছেন, ঢাকায় নির্মাণকাজ, যানবাহন ও ইটভাটার কারণে দূষণ এখনো খুব বেশি এবং উন্নতি হচ্ছে খুবই ধীরে।
পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিল্প কারাখানার দূষণ নজরদারির জন্য একটি পরিকল্পনা নেয়া হবে। এর আওতায় শিল্প-কারখানার চিমনিতে সেন্সর বসানো হবে কারণ এই চিমনি থেকে কী পরিমাণ ধোঁয়া নির্গমন করে তা সেন্সর থেকে জানা যাবে। পরিবেশ অধিদফতর রিয়েল টাইমে ধোঁয়া ও দূষণ পর্যবেক্ষণ করবে। তা থেকে পরিবেশ অধিদফতর রিয়েল টাইম ড্যাটাও সংগ্রহ করবে। অপর দিকে ঢাকায় ধুলাদূষণ কমাতে রাস্তা নির্মাণের সময় পানি ছিটানো, খোলামাটি ঢেলে রাখা, নির্মাণ স্থান ঘেরাও ও ফেন্সিং করা এবং রাস্তা মেরামতের প্রতিও জোর দেয়া হবে।