সিলেট অঞ্চলে ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ফসল শঙ্কায়

উদ্বেগে হাওরপাড়ের কৃষক

Printed Edition

আবদুল কাদের তাপাদার সিলেট

মৌসুমের শুরুতেই কালবৈশাখী ঝড় ও টানা শিলাবৃষ্টির কবলে পড়েছে সিলেট অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। গত চার দিন ধরে দফায় দফায় ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে বোরো ধানের ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাওরপাড়ের কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে।কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সিলেট অঞ্চলের বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। গত নভেম্বর থেকে দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় এ অঞ্চলের বোরো চাষ খরার কবলে পড়ে। তবে ফাল্গুন মাসের শেষ দিন গত বৃহস্পতিবার প্রথম বৃষ্টিপাত শুরু হলে কৃষকদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বৃষ্টির সাথে শুরু হয় কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টি, যা টানা চার দিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় আঘাত হানছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টি হওয়ায় ধানক্ষেতের গাছ অনেক জায়গায় হেলে পড়েছে। বিশেষ করে ধানের থোড় বের হওয়ার সময় এ ধরনের আবহাওয়া ফসলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। ফলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের ফলন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত সিলেট জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঝড়ো হাওয়ার সাথে ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টি হয়েছে। গত চার দিনে সিলেটে প্রায় ৩০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঝড়ে অনেক স্থানে গাছপালা উপড়ে পড়েছে এবং কিছু এলাকায় বাড়িঘরের টিনের চাল উড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শিলাবৃষ্টিতে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায়, বিশেষ করে হাকালুকি হাওরপাড়ের এলাকায় বোরো ধানের ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।

সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। জেলার দিরাই, শাল্লা, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর ও সদর উপজেলায় গত তিন দিন ধরে ঝড়ো হাওয়ার সাথে তীব্র শিলাবৃষ্টি হয়েছে। কয়েক মিনিটের শিলাবৃষ্টিতেই অনেক ধানক্ষেতে গাছ নুয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওরে প্রায় ১০ লাখ কৃষক দুই লাখ ২৩ হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। আর এক মাসের মধ্যেই এসব ধান কাটার কথা। তবে বর্তমান আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

দিরাই উপজেলার মাইট্টাপুর গ্রামের কৃষক মুতালিব উল্লা বলেন, ‘সারা বছর আমরা এই বোরো ধানের অপেক্ষায় থাকি। অনেক কষ্ট করে চাষ করেছি। এখন যদি শিলাবৃষ্টি বাড়ে, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে।’

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কালিপুর গ্রামের কৃষক শফিক আহমেদ বলেন, ধানের শিষ আসতে শুরু করেছে। এ সময় ঝড় বা শিলাবৃষ্টি হলে ধান মাটিতে পড়ে যায়, ফলে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

জামালগঞ্জ উপজেলার বড় ঘাগটিয়া গ্রামের কৃষক লতিফ মিয়া বলেন, ‘নিজের জমি নেই, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করেছি। গত দুই দিনের শিলাবৃষ্টিতে ধানের কী অবস্থা হবে তা নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’ এদিকে মৌলভীবাজার জেলাতেও গত চার দিনে কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির প্রভাব দেখা গেছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এ সময় জেলায় প্রায় ১০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বোরো ধানের আবাদ রয়েছে, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ হাকালুকি হাওর অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। এখানকার কৃষকরাও আবহাওয়ার বিরূপ পরিস্থিতিতে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জানান, জেলার কয়েকটি উপজেলায় শিলাবৃষ্টির ঘটনা ঘটেছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে শিলাবৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ধানের ক্ষতি হতে পারে। তিনি বলেন, কৃষি বিভাগ পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

এদিকে আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত হতে পারে। এ সময় দমকা বা ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনাও রয়েছে। বিশেষ করে সিলেট, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকায় বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

হাওরপাড়ের কৃষকদের আশঙ্কা, এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে কষ্টের বোরো ধান ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই দ্রুত আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশায় দিন গুনছেন তারা।