ভূমধ্যসাগরে ১৮ বাংলাদেশী তরুণের সলিলসমাধি

Printed Edition
back-3
ভূমধ্যসাগরে নিহতদের ৫ জন : নয়া দিগন্ত

সিলেট ব্যুরো

  • ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন ২৬ জন।তারা জানিয়েছেন, নিহতদের লাশ সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে
  • সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারাবাজারে শোকের মাতম
  • ১০/১২ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে নিহতরা ইতালিতে যাওয়ার চুক্তি করেন

লিবিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি দিতে গিয়ে গ্রিসের উপকূলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় একটি নৌকায় ছয়দিন ধরে ভাসতে থাকা ১৮ বাংলাদেশীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌযানটির বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা। নিহতদের মধ্যে ১০ জনের বাড়ি সিলেটের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারাবাজার বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। নিহতের লাশ সাগরে ফেলে দেয়ার ঘটনা এই মর্মান্তিক ‘গণহত্যাকে’ বিভীষিকাময় করে তুলেছে।

প্রবাসীবহুল সুনামগঞ্জ ও সিলেটজুড়ে এখন শোকের মাতম চলছে। পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে আর একটু ভালো থাকার আশায় জমিজমা বিক্রি করে ইউরোপের পথে পা বাড়িয়েছিলেন সুনামগঞ্জের এই ১০ টগবগে যুবক। দালালের প্রলোভনে পড়ে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ টাকা খরচ করে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্নের সলিলসমাধি ঘটেছে ভূমধ্যসাগরের নোনা জলে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও গণমাধ্যম কর্মীদের সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, নিহত ১০ জনের মধ্যে জগন্নাথপুরেই পাঁচজন। তারা হলেন- পাইলগাঁও গ্রামের আমিনুর রহমান (৩৫), টিয়ারগাঁওয়ের শায়ক মিয়া (২০), ইছগাঁওয়ের মো: আলী, বাউরি গ্রামের সুহানুর এবং পৌরসভার কবিরপুর গ্রামের নাঈম।

দিরাই উপজেলার চারজন হলেন- জাহানপুর গ্রামের মুজিবুর রহমান (৪০), তারাপাশা গ্রামের মো: সাহান (৩৩), সাজিদুর রহমান (২৮), নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০) এবং দোয়ারার দোহালিয়ার পানাইল গ্রামের ফাহিম (২২)। এ ছাড়া করিমপুর ইউনিয়নের তারেক (২২) নামে একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।

জানা গেছে, গত শুক্রবার (২৭ মার্চ) গ্রিসের বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের অদূরে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যু হয়েছে এই ১০ যুবকের।

জানা যায়, এ মানবপাচারের পেছনে রয়েছে একটি সক্রিয় সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক দালালচক্র। স্থানীয়ভাবে ছাতক থানার দুলাল মিয়া ও তার ভাই বিল্লালের হোতা। অভিযোগ রয়েছে, গ্রিসে অবস্থানরত বিল্লাল বিদেশ থেকে পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। আর দেশে থেকে দুলাল মিয়া যুবকদের ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন।

স্বজনদের ভাষ্যানুযায়ী, আমিনুর রহমান ১১ লাখ টাকার চুক্তিতে এ পথে যাত্রা শুরু করেন। তিন দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর আশ্বাস দিলেও তাকে প্রায় তিন মাস লিবিয়ার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়।

জীবিত উদ্ধার হওয়া এক যাত্রী জানান, বড় জাহাজের প্রতিশ্রুতি দিলেও শেষ পর্যন্ত তাদের ছোট প্লাস্টিক ও রাবারের বোটে তুলে দেয়া হয়। প্রতিকূল আবহাওয়ায় পথ হারিয়ে ছয়দিন খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ঠাণ্ডা ও ক্লান্তিতে একে একে প্রাণ হারান অনেকে। পরে পাচারকারীদের নির্দেশে লাশগুলো সাগরেই ফেলে দেয়া হয়।

এ দিকে জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, জগন্নাথপুর, দিরাই ও দোয়ারার এ তরুণদের মৃত্যুতে পুরো সুনামগঞ্জে চলছে শোকের মাতম। এলাকাবাসী দালাল সিন্ডিকেটের হোতাসহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি জানিয়েছেন।

শুক্রবার গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলীয় রক্ষা বাহিনী ফ্রন্টেক্সের একটি জাহাজ গ্রিসের বৃহত্তম এবং ভূমধ্যসাগরের পঞ্চম বৃহত্তম দ্বীপ ক্রিটের কাছ থেকে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ জীবিত অবস্থায় ২৬ জনকে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী ও এক শিশুও রয়েছে।

কোস্ট গার্ড পরে সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানায়, ওই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ২১ জন বাংলাদেশি, চারজন দক্ষিণ সুদানি এবং চাদের একজন নাগরিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

জীবিতদের বরাতে গ্রিসের কোস্ট গার্ড জানায়, রাবারের নৌকাটি ২১ মার্চ পূর্ব লিবিয়ার বন্দরনগরী তোবরুক বন্দর থেকে গ্রিসের উদ্দেশে রওনা দেয়। ছয়দিন ধরে খাবার ও পানীয় ছাড়াই সমুদ্রে ভাসতে থাকায় যাত্রীরা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়েন। প্রতিকূল আবহাওয়া, খাদ্য ও পানির সঙ্কটে ২২ জনের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন দক্ষিণ সুদানের দুই পাচারকারীকে গ্রেফতার করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। তাদের বয়স যথাক্রমে ১৯ ও ২২ বছর। তাদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ ও অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে তদন্ত চলছে।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের প্রথম দুই মাসেই ইউরোপে অভিবাসনের চেষ্টাকালে মৃতের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ভূমধ্যসাগরে ৫৫৯ জন মারা গেছেন। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ২৮৭।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে আসা বহু অভিবাসীর জন্য গ্রিস একটি প্রধান প্রবেশদ্বার।

নিহতদের স্বজনরা জানিয়েছেন, প্রায় তিন থেকে চার মাস আগে দালালের মাধ্যমে তারা লিবিয়ায় পৌঁছান। সেখান থেকে তথাকথিত ‘গেমঘর’-এ রেখে গত সপ্তাহে তাদের সাগরপথে গ্রিসের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। কিন্তু সাগরের উত্তাল ঢেউ আর তীব্র অভাবের কাছে হার মানতে হয়েছে তাদের। জগন্নাথপুরের আমিনুর রহমান, শায়ক মিয়া, মো: আলী, সোহানুর রহমান ও নাঈমের মতো তরুণরা যখন না ফেরার দেশে চলে গেলেন, তখন তাদের বাড়িতে চলছে কান্নার রোল। নিহত নাঈমের ভাই ঝিনুক মিয়া ক্ষোভ ও দুঃখে জানিয়েছেন, দালালের লোকজনের কথা বিশ্বাস করে তার ভাই সাগরে প্রাণ দিয়েছে, অথচ দালালেরা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

দিরাই উপজেলার ময়নুজ্জামান সর্দার ময়না, সাহান এহিয়া, সাজিদুর রহমান এবং মুজিবুর রহমানের লাশ মৃত্যুর পর সাগরে ফেলে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে, যা এই ট্র্যাজেডিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং পুলিশ প্রশাসন এই মর্মান্তিক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

জগন্নাথপুর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল জানান, ইউরোপে যাওয়ার নেশায় এই পরিবারগুলো আজ কেবল প্রিয়জনকেই হারায়নি, বরং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, তারা ইতোমধ্যে ৮ থেকে ১০ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দালালের বিচার চেয়ে স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদ এখন একটাই প্রশ্ন তুলছে, অবৈধ পথে এভাবে আর কত প্রাণ ঝরলে টনক নড়বে পাচারকারী চক্র ও প্রশাসনের?