পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণে ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই
Printed Edition
নাসির উদ্দিন চৌধুরী
পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধি ও বাজারে দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে ভাল কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই- এমনটিই মনে করেন বাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, আমাদের পুঁজিবাজারে এখন কয়েকটি হাতে গোনা কোম্পানি রয়েছে যেগুলোতে আস্থার সাথে বিনিয়োগ করা যায়। এত স্বল্প পরিসরে বিদেশীরাতো নয়ই; দেশী সক্ষম বিনিয়োগকারিরাও এখানে বিনিয়োগে উৎসাহ পান না। মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি ছাড়া বিনিয়োগ আকর্ষণের দ্বিতীয় কোনো পথ নেই।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুসারে দেশের পুঁজিবাজারের মূলধন দেশের মোট জিডিপির মাত্র ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আমাদের পাশের দেশ ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ ইন্ডিয়ার বাজার মূলধন তাদের দেশের মোট জিডিপির ১২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এমনকি শ্রীলঙ্কার কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জ ও পাকিস্তানের করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধনও তাদের নিজ নিজ জিডিপির যথাক্রমে ২৬ দশমিক ৭০ ও ১৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ। ডিএসই থেকে পাওয়া ডিসেম্বর ২০২৫ এর তথ্য অনুসারে এ অঞ্চলের স্টক এক্সচেঞ্জেগুলোর মধ্যে জিডিপি ও বাজারমূলধনের অনুপাতের দিক থেকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে হংকং ও তাইওয়ান স্টক এক্সচেঞ্জ। এ দু’টি স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধনের জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ১৪৩৯ দশমিক ৭৫ ও ৩২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এ দিক থেকে এ অঞ্চলের সব স্টক মার্কেটের তুলনায় আমাদের পুঁজিবাজারের আকার বা পরিসরই সবচেয়ে ছোট বলা যায়।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রায়ত্ব বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আবু আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বাজারে বিনিয়োগ চাইলে ভাল কোম্পানির তালিকাভুক্তির বিকল্প নেই। ভালো কোম্পানি না থাকলে বিনিয়োগ করবে কোথায়? সরকার বারবার উদ্যোগ নিয়েও পারছে না রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক কোম্পানিগুলোকে বাজারে নিয়ে আসতে। তা ছাড়া দেশে অনেক বহুজাতিক কোম্পানি ব্যবসা করছে। আশপাশের দেশগুলোতে এসব কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত থাকলেও এখানে তারা তালিকাভুক্ত হতে চায় না। ইনসেনটিভ দিয়ে হলেও এসব কোম্পানিকে বাজারে তালিকাভুক্তিতে উৎসাহিত করতে হবে। তা না হলে বিনিয়োগের আশা করা বৃথা। আর বিনিয়োগ না এলে পুঁজিবাজারের মূল উদ্দেশ্যই রইল না।
সর্বশেষ ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পুঁজিবাজারে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের কোম্পানি পুঁজিবাজারে নতুনভাবে তালিকাভুক্ত হয় এবং কয়েকটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির আংশিক শেয়ার ছাড়া হয়। এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন মেয়াদে আরো বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবতার মুখ দেখেনি। সবশেষ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূস অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ উদ্যোগ নিলেও আবারো ব্যর্থ হন। রাষ্ট্রায়ত্ত ভালো কোম্পানিগুলোর অন্তত কয়েকটি তালিকাভুক্ত করা গেলে বাজারের গভীরতা কিছুটা হলেও বাড়ত।
গত ১০ বছরের মধ্যে একমাত্র টেলিকমিউনিকেশন খাতের বহুজাতিক কোম্পানি রবি অজিয়াটা ছাড়া উল্লেখ করার মতো কোনো ভালো কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়নি। অথচ এই সময়ে পুঁজিবাজার থেকে লাখ কোটি টাকার ওপরে তোলা হয়েছে কিছু নামসর্বস্ব কোম্পানি তালিকাভুক্ত করে। শুধু ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে নয়, আইপিওর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতেও এসব কোম্পানির অনেকগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এসব কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে মানা হয়নি কোনো ধরনের আইন ও নীতি নৈতিকতা। আর তালিকাভুক্তির পর বছর যেতে না যেতেই এসব কোম্পানি বাজারের জন্য সম্পদের পরিবর্তে বিপদে পরিণত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে প্রায় ৩০টি কোম্পানির এ মুহূর্তে উৎপাদন বন্ধ। আরো বেশ কিছু কোম্পানি আইনের নানা ফাঁক ফোকর ব্যবহার করে তালিকাভুক্তির শর্ত পূরণ করে বাজারে নিজেদের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখলেও প্রকৃতপক্ষে এসব কোম্পানি পুঁজিবাজারের মানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্প্রতি সিকিউরিটিজ তালিকাভুক্তির আইপিও রুলস সংশোধন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পুঁজিবাজার সংস্কার কমিঠির সুপারিশ ক্রমে এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধিত এ আইপিও রুলসে অতীতের ভুলগুলো শুধরে নেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সংশোধিত এই রুলস অনুযায়ী যেসব কোম্পানি তাদের শেয়ারদর অভিহিত মূল্যের বেশি দাবি করবে তাদের অবশ্যই ব্রিক বিল্ডিং পদ্ধতিতেই বাজারে আসতে হবে। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতেও কোম্পানির শেয়ারের প্রাইসিংর ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বেশ কিছু পরিবতর্দন আনা হয়েছে।
সংশোধিত এ রুলস সম্পর্কে জানতে চাইলে বেসরকারি ব্যাংক পূবালীর সিকিউরিটিজ হাউজ পূবালী ব্যাংক সিকিরিটিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: আহসান উল্যা নয়া দিগন্তকে বলেন, সংশোধিত রুলসে বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রাইসিংয়ে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে তা একটি কোম্পানির শেয়ারের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। আগে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা থেকে যেত। সংশোধিত এ বিধিমালায় যে সুযোগ রাখা হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বিএসইসির পরিচালক মো: আবুল কালাম বলেন, স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও সুপারিশের আলোকে চূড়ান্ত করা নতুন পাবলিক ইস্যু রুলস শেয়ারবাজারের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং এর মাধ্যমে আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি শেয়ার দর যৌক্তিক পর্যায়ে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বিএসইসি মনে করে, এই বিধিমালার মাধ্যমে ভালো কোম্পানি বাজারে আসতে যেমন আগ্রহী হবে তেমনি বাজারে কৃত্রিম দর প্রস্তাব, কার্টেল ও প্রাইস ম্যানিপুলেশনের সুযোগ অনেকাংশে কমে আসবে।
তিনি বলেন, নতুন এ বিধিমালাটি কোনো একক সিদ্ধান্তের ফল নয়; বরং পুঁজিবাজারের সব অংশীজনের মতামত বিবেচনায় নিয়েই এটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। আইপিও রুললসের খসড়া প্রকাশের পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৭০টিসহ মোট ২২০টি মন্তব্য ও সুপারিশ পাওয়া যায়। কমিশন প্রতিটি মন্তব্য ও সুপারিশ গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেছে এবং সেসব আলোচনার প্রতিফলন চূড়ান্ত বিধিমালায় রয়েছে। তিনি বলেন, খসড়া ও চূড়ান্ত বিধিমালার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, সেটিই প্রমাণ করে যে স্টেকহোল্ডারদের মতামত বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, স্বচ্ছতার সাথে পুঁজিবাজারে কোম্পানির তালিকাভুক্তিই নিশ্চিত করতে পারে কোন কোম্পানি বাজারের জন্য ভালো পারফর্ম করবে। আর এভাবে ভালো ও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তিই পারে বাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে।