ঈদযাত্রায় দেশজুড়ে দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৩৯৪ জনের

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • সড়কে নিহত ৩৫, শুধু পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি ২,১৭৮ জন
  • গত বছরের চেয়ে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে ৮.৯৫ শতাংশ
  • মোট নিহতের ৩৮.৪৬ শতাংশ মোটরসাইকেল আরোহী
  • ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের চেয়ে এবারের ঈদযাত্রায় বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে : মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী

ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ২৮ মার্চ পর্যন্ত বিগত ১৫ দিনে সড়ক, রেল ও নৌ পথে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও এক হাজার ২৮৮ জন আহত হয়েছে। এ সময় দেশের সড়ক মহাসড়কে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এক হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছে। একই সময়ে রেলপথে ২৩টি দুর্ঘটনায় ৩৫ জন নিহত, ২২৩ জন আহত হয়েছে। নৌপথে আটটি দুর্ঘটনায় আট জন নিহত, ১৯ জন আহত ও তিনজন নিখোঁজ রয়েছে। গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী এক প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরে ৩১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২২ জন নিহত ও ৮২৬ জন আহত হয়েছিল। বিগত বছরের সাথে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা আট দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রাণহানি আট দশমিক ২৬ শতাংশ, আহত ২১ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ বেড়েছে। বরাবরের মতো এবারো দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১২৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৫ জন নিহত, ১১৪ জন আহত হয়েছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ১২ শতাংশ, নিহতের ৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং আহতের ১০ দশমিক ৮৯ শতাংশ প্রায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একই সময়ে জাতীয় অর্থোপেডিক (পঙ্গু) হাসপাতালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দুই হাজার ১৭৮ জন ভর্তি হয়েছে। সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ৭১ জন চালক, ৫৫ জন শিশু, ৫৪ জন পথচারী, ৫১ জন নারী, ৪২ জন শিক্ষার্থী, ১০ জন পরিবহন শ্রমিক, সাতজন শিক্ষক, চারজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, তিনজন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, তিনজন প্রকৌশলী, দুইজন সাংবাদিক, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও একজন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।

সংঘটিত দুর্ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ২৭ দশমিক ১৬ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান, ১৬ দশমিক ২২ শতাংশ বাস, ১৫ দশমিক ২৮ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা, আট দশমিক ৪৯ শতাংশ কার-মাইক্রো, সাত দশমিক ৭৩ শতাংশ নছিমন-করিমন ও সাত দশমিক ৩৫ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৮৩ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩২ দশমিক ৩৬ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেয়ার ঘটনা, ২২ দশমিক ২৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনায়, শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে, শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ চাকায় ওড়না পেছিয়ে ও আট দশমিক ৩৮ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৪৩ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩০ দশমিক শূন্য পঁাঁচ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২১ দশমিক ৯৬ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়। এ ছাড়াও সারা দেশে সংঘটিত মোট দুর্ঘটনার চার দশমিক শূন্য চার শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে ও শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো: মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, চলমান ইরান-ইসরাইল যুদ্ধে গত ১৫ দিনে হতাহত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা অনেক বেশি। সরকার শপথ গ্রহণের দুই দিন পরে রমজান শুরু, এক মাসের মাথায় ঈদযাত্রা। নতুন সরকারের ব্যর্থতা খুঁজতে নয়; বরং সরকারকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার মানসে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো ঈদযাত্রায় প্রাণহানির পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। সরকার নতুন হলেও পুরনো আমলা, পূর্বের মাফিয়া নেতাদের অনুসারী বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনের বর্তমান সরকার-সর্মথিত নেতাদের চাপে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো এবারো সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, বিআইডব্লিউটিএসহ পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থার ঈদ ব্যবস্থাপনা সভায় লাখো যাত্রীর পক্ষে কথা বলার মতো যাত্রী ও নাগরিক সমাজের কোনো প্রতিনিধি রাখা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, মালিকরা একচেটিয়া সুবিধা লুফে নিতে এমন অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক সংগঠন প্রভাবমুক্ত থাকায় ঈদযাত্রা খানিকটা স্বস্তিদায়ক হয়েছিল, যা সর্বমহলে প্রশংসা পেয়েছে। এবারের ঈদে বাস মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ফেডারেশনের প্রভাবের কারণে ভাড়া নৈরাজ্য ও সড়ক দুর্ঘটনা, পরিবহনের বিশৃঙ্খলা অতীতের দু’টি ঈদের তুলনায় বেড়েছে। সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা ছিল বাস মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রিত। ফলে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পদ্ধতি অনুসরণের কারণে সড়ক পরিবহন সেক্টরে সরকারের কিছু কিছু কর্মকাণ্ড ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা অবাধে চলাচল বন্ধ করে উল্টোপথে যানবাহন, সড়কে চাঁদাবাজি, পণ্যবাহী যানে যাত্রী পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঈদযাত্রায় একসাথে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘœ করতে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি ঢাকায় জনসংখ্যার চাপ কমানোর দাবি জানান তিনি।