হাওরপাড়ে কৃষকের হাহাকার

অতিবৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা-আধাপাকা বোরো ধান : বাঁধ ভেঙে নতুন বিপর্যয়

Printed Edition
Font-------------------------2
ভারী বর্ষণে হাওরে ডুবে গেছে হাজার হাজার একর ফসলিজমির ধান। সেই সাথে ডুবে গেছে কৃষকের রঙিন স্বপ্নও। বাজিতপুর কিশোরগঞ্জ থেকে ছবিটি পাঠিয়েছেন আলি জামশেদ

ফজলুল হক রোমান, তৌহিদ চৌধুরী প্রদীপ, আলি জামশেদ ও সোহেল মিয়া

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলে আবারো প্রকৃতির নির্মম আঘাত নেমে এসেছে। টানা অতিবৃষ্টি, বজ্রঝড় এবং উজানের পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনাসহ বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান। বছরের একমাত্র ফসল হারানোর আশঙ্কায় কৃষকদের চোখে এখন শুধু হতাশাÑ হাওরজুড়ে যেন এক নিঃশব্দ আর্তনাদ।

হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা প্রায় পুরোপুরি নির্ভর করে একমাত্র বোরো ফসলের ওপর। সারা বছর ঋণ, শ্রম ও আশা নিয়ে চাষ করা সেই ধান এখন চোখের সামনেই পানির নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল নেমে এসে হাওরের পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সাথে স্থানীয় টানা বর্ষণ মিলিয়ে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ধানতে তলিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে।

উৎপাদনের ভাণ্ডার এখন বিপর্যস্ত : কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে চলতি মৌসুমে প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার ল্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। তবে মৌসুমের শেষভাগে এসে অতিবৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল তিগ্রস্ত হয়েছে।

সরকারি হিসাবে ৫৬ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলা হলেও কৃষকদের দাবি, বাস্তবে তা ৩০-৪০ শতাংশের বেশি নয়। এখনো বিশাল অংশের ধান মাঠেই পড়ে আছে, যার অনেকটাই ইতোমধ্যে পানির নিচে।

জলাবদ্ধতার কারণে অধিকাংশ জমিতে কম্বাইন হারভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটতে হচ্ছে কৃষকদের।

শ্রমিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরো জটিল করেছে। বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেক কৃষক দ্বিগুণ খরচে ধান কাটছেন, আবার কেউ কেউ খরচের চাপ সামলাতে না পেরে ধান কাটাই বন্ধ রেখেছেন।

খলায় পচছে কাটা ধান, বাঁধ ভেঙে নতুন বিপর্যয় : যেসব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও নিরাপদ নয়। টানা বৃষ্টির কারণে রোদ না থাকায় খলায় রাখা ধান শুকানো যাচ্ছে না। অনেক েেত্র ধানে অঙ্কুরোদগম শুরু হয়েছে। ফলে বাজারমূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জামালগঞ্জের কৃষক তোফায়েল আলম চৌধুরী বলেন, ‘সারা বছর কষ্ট করেও এখনো এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারিনি। সংসার চালাব কিভাবে বুঝতে পারছি না।’

মধ্যনগরের ইকরাছই হাওরে মনাই নদীর পানি ঢুকে প্রায় ১১৪ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে নির্মিত একটি বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, বাঁধটি সঠিকভাবে রণাবেণ করা হয়নি। ফলে প্রবল পানির চাপে তা ভেঙে পড়ে এবং কয়েকটি গ্রামের হাজারো কৃষক তিগ্রস্ত হন।

ঝুঁকিতে ফসল রা বাঁধ, অবকাঠামোগত দুর্বলতা

টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি বাড়তে থাকায় ফসল রা বাঁধ নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। উজান থেকে আরো ঢল নামলে অনেক বাঁধ টিকবে কি নাÑ তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

জামালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় ইতোমধ্যে কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে প্রায় ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করেছে।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, অনেক বাঁধ অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত এবং যথাসময়ে সংস্কার করা হয়নি। পাশাপাশি নদী-নালা খননের অভাব জলাবদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিশোরগঞ্জেও একই চিত্র

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলেও একই পরিস্থিতি বিরাজ করছে। নিকলী, মিঠামইনসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক ধান কাটা হলেও য়তির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা যায়নি।

নেত্রকোনায় পানির নিচে স্বপ্ন

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরে বোরো ধান তলিয়ে গেছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার উৎপাদন ল্যমাত্রা প্রায় ১১ লাখ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন।

তবে সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে প্রায় অর্ধেক ফসল পানির নিচে চলে গেছে বলে কৃষকদের দাবি। অনেকেই বাধ্য হয়ে কাঁচা ধান কাটলেও তা রা করা যায়নি।

সদর উপজেলার দিয়াইল বিলে গিয়ে দেখা গেছে, কোথাও বুকসমান আবার কোথাও গলা সমান পানি। কোথাও সামান্য ধানের শীষ দেখা গেলেও অধিকাংশ তেই পানির নিচে।

কৃষক মালেকুল বলেন, ‘আগে যেখানে ৫০-৬০ মণ ধান পেতাম, এবার দেড় মণও তুলতে পারিনি।’

আরেক কৃষক মোহন আলী বলেন, ‘বর্গা জমি নিয়ে চাষ করছিলাম; কিন্তু এক মুঠো ধানও তুলতে পারিনি।’

ঋণ ও দারিদ্র্যের ফাঁদ

হাওরাঞ্চলের অধিকাংশ কৃষক ঋণ করে চাষাবাদ করেন। ফসল ঘরে তুলেই তারা ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু এবারের তিতে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন।

ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত হলেও এখন ডুবে থাকা ধান কাটার সুযোগ নেই। ফলে কৃষকদের সামনে ঋণের বোঝা আরো বেড়ে যাচ্ছে।

বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। অন্যান্য বছর খলায় বেপারি ও ফড়িয়াদের আনাগোনা থাকলেও এবার তা নেই। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন।

প্রশাসনের উদ্যোগ : কিছুটা রোদ, তবু অনিশ্চয়তা

সুনামগঞ্জের কিছু এলাকায় বৃষ্টির পর রোদ উঠলেও কৃষকদের দুর্ভোগ কমেনি। জলাবদ্ধতা ও পচে যাওয়া ধান নিয়ে তারা এখনো সঙ্কটে রয়েছেন।

কৃষি কর্মকর্তারা ধান উঁচু স্থানে শুকানোর পরামর্শ দিলেও বাস্তবে তা অনেক েেত্র সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছেন। য়তির পরিমাণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে জরিপ চলছে।

তবে বাস্তবতা হলোÑ প্রকৃতির কাছে হাওরের কৃষক এখনো অসহায়। সামনে আরো বৃষ্টির আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে।

হাওরাঞ্চলের এই সঙ্কট শুধু একটি অঞ্চলের সমস্যা নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সাথেও জড়িত। আজ হাওরে দাঁড়িয়ে একটাই প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছেÑ বছরের একমাত্র ফসল কি ঘরে উঠবে, নাকি পানির স্রোতে ভেসে যাবে কৃষকের সব স্বপ্ন?