ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজায় সাড়ে ১৫ হাজার শিশুর প্রাণহানি
Printed Edition
- নারী-শিশুসহ আরো নিহত ৩৭, ইয়েমেনে মার্কিন হামলা
- ইসরাইলে রকেট হামলা
- যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প-নাহিয়ান ফোনালাপ
- গাজায় বিক্ষোভে হামাসের বিরুদ্ধে স্লোগান
গাজায় ইসরাইলের গণহত্যা চলছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে। সেই দিনের পর থেকে বলা যায়, গাজায় নিরবচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী, মাঝের স্বল্প সময়ের যুদ্ধবিরতি ছাড়া। প্রায় দেড় বছর ধরে চলা ইসরাইলি হত্যাযজ্ঞে গাজায় নিহত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ১৫ হাজার ৬১৩ জনে দাঁড়িয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ন মিডল ইস্ট মনিটর জানিয়েছে, গাজায় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে পরিচালিত ইসরাইলি হামলায় ১৫ হাজার ৬১৩ শিশু নিহত হয়েছে। এই সংখ্যা গাজা ভূখণ্ডে মোট নিহত ৫০ হাজার ৮২ জনের ৩১ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ের টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রকাশিত এক ইনফোগ্রাফিককে এ তথ্য জানানো হয়েছে। ইনফোগ্রাফিকটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত শিশু হতাহতের চিত্র তুলে ধরে। ইনফ্রোগ্রাফিক অনুযায়ী, শিশুর প্রাণহানির সংখ্যা অবরুদ্ধ অঞ্চলটিতে নিহত মোট ফিলিস্তিনির ৩১ শতাংশ। এ ছাড়া এ সময়ে ইসরাইলি আগ্রাসনে আহত হয়েছে আরো ৩৩ হাজার ৯০০ শিশু, যা মোট আহত এক লাখ ১৩ হাজার ৪০৮ জনের ৩০ শতাংশ।
ইনফোগ্রাফিকটিতে আরো বলা হয়েছে, এ সময়ে ইসরাইল ৮২৫ জন এক বছরের কম বয়সী শিশুকে হত্যা করেছে এবং ২৭৪টি শিশু জন্ম নেয়ার পরই মারা গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর থেকে ইসরাইল তাদের গণহত্যা আবার শুরু করার পর ৭৩০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ৩৬৭ জন আহত হয়েছে, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
এ দিকে তিন সপ্তাহেরও বেশি ধরে গাজা উপত্যকায় ত্রাণ প্রবেশ করতে দিচ্ছে না ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর প্রশাসন। চিকিৎসা সরঞ্জাম, জ্বালানি সঙ্কট আর হামলার তীব্রতায় উপত্যকাজুড়ে সব হাসপাতালেই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া দিনে দিনে কঠিন থেকে আরো কঠিন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া ইসরাইলি হামলায় যে পরিমাণ মানুষ হতাহত হচ্ছে, সে তুলনায় চিকিৎসাসেবা দেয়ার সক্ষমতা নেই হাসপাতালগুলোর।
ত্রাণ প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না, তার ওপর কোনো ধরনের পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই হাসপাতালে হামলা চালাচ্ছে- একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলছেন ফিলিস্তিনিরা। প্রায় এক মাসের যুদ্ধবিরতির পর গত ১৮ মার্চ থেকে অবরুদ্ধ উপত্যকা গাজায় আবার বর্বরতা শুরু করেছে নেতানিয়াহুর প্রশাসন। ইসরাইলি আগ্রাসনে এই এক সপ্তাহে প্রাণ গেছে সাত শতাধিক ফিলিস্তিনির। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর উপত্যকায় নেতানিয়াহু প্রশাসনের বর্বরতা শুরুর পর গত ১৮ মাসের যুদ্ধে গাজায় ৫০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।
নারী-শিশুসহ আরো নিহত ৩৭, ইয়েমেনে মার্কিন হামলা : গাজায় ইসরাইলি হামলায় আরো ৩৭ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অনেকেই নারী ও শিশু। এ ছাড়া সিরিয়াতেও হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। ওই হামলায় দেশটিতে প্রাণ গেছে ছয়জনের। এ ছাড়া ইয়েমেনেও মার্কিন বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বুধবার এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মঙ্গলবার গাজায় ইসরাইলি বাহিনী কমপক্ষে ৩৭ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অনেক শিশু ও নারীও রয়েছেন। শিশুবিষয়ক আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন বলেছে, গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনী আবার যুদ্ধ শুরু করার পর এক সপ্তাহে ২৭০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত কয়েক দিন শিশুদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
এ ছাড়া সিরিয়ায় ইসরাইলের বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। দেশটির ডেরায় চালানো এ হামলায় কমপক্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে কাতার ও সৌদি আরব। অন্য দিকে ইয়েমেনে মার্কিন সামরিক বাহিনী বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে হাউছিদের আবার আক্রমণের হুমকির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন বাহিনী ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
হাউছি-সংশ্লিষ্ট আল মাসিরাহ টিভি জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী উত্তরাঞ্চলীয় সাদা প্রদেশের সাহার জেলায় দু’টি অভিযান চালিয়েছে। চ্যানেলটি একই জেলায় তিনটি হামলার খবর প্রকাশ করার কয়েক ঘণ্টা পরে সর্বশেষ অভিযানগুলো শুরু হয়।
ইসরাইলে রকেট হামলা : গতকাল বুধবার গাজা থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে অন্তত দু’টি রকেট নিক্ষেপ করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী। তবে এ হামলায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহতের তথ্য জানা যায়নি। এক বিবৃতিতে ইসরাইলের সেনাবাহিনী বলেছে, গাজা থেকে ইসরাইলি ভূখণ্ডে দু’টি রকেট ছোড়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি রকেটে বাধা দেয়া হয়েছে এবং অন্যটি গাজা সীমান্তের কাছে ইসরাইলি ভূখণ্ডে ভূপাতিত হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজা উপত্যকা লাগোয়া ইসরাইলি ভূখণ্ডে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৩ মিনিটের দিকে সাইরেন বাজিয়ে বাসিন্দাদের সতর্ক করে দেয়া হয়। এর পরপরই গাজা থেকে ছোড়া দু’টি রকেটের ইসরাইলি আকাশসীমায় প্রবেশ শনাক্ত করা হয়েছে। ‘এর মধ্যে একটি রকেট সফলভাবে ভূপাতিত করেছে ইসরাইলি বিমানবাহিনী। আর অন্য রকেটটি ইসরাইলের জিমরাত এলাকায় পড়েছে,’ বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। তবে গাজা থেকে ছোড়া রকেটের আঘাতে ইসরাইলে কোনো ক্ষয়ক্ষতি কিংবা হতাহত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনী কোনো তথ্য জানায়নি।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে ট্রাম্প-নাহিয়ান ফোনালাপ : গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার প্রচেষ্টা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ফোনালাপ হয়েছে। এমন দাবি করেছে আমিরাতভিত্তিক বার্তাসংস্থা ওয়াম। রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের সাথে ফোনকলে গাজার অধিবাসীদের জন্য ত্রাণসহায়তা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন আল নাহিয়ান। এ ছাড়া স্থায়ী শান্তির জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন চেয়েছেন তিনি।
গাজা সঙ্কট সমাধানে ফেব্রুয়ারি মাসে এক বিস্ফোরক প্রস্তাব নিয়ে আসেন ট্রাম্প। ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে উচ্ছেদ করে সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের রিভেইরা বা বিলাসবহুল নগরী বানানোর পরিকল্পনা প্রকাশ করেন তিনি। তবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বিবৃতি দেয় আমিরাতসহ আরব দেশগুলো। পরে গাজা পুনর্গঠনে বিকল্প এক পরিকল্পনা সামনে নিয়ে আসে মিসর। ৫৩ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে গাজাবাসীদের উৎখাতের প্রয়োজন হবে না বলে জানানো হয়। আমিরাতসহ আরব দেশগুলো এই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ট্রাম্প ও আল নাহিয়ানের ফোনালাপে গাজা পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, ওয়ামের প্রতিবেদনে সেটি নিশ্চিত করা হয়নি।
গাজায় বিক্ষোভে হামাসের বিরুদ্ধে স্লোগান : বিবিসি জানায়, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম উপত্যকায় হামাসবিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। মঙ্গলবার শত শত মানুষ রাস্তায় নেমে গাজার ক্ষমতা থেকে হামাসের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেছেন। মাস্ক পরা হামাস যোদ্ধাদের বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে দেখা যায়। অনেক বিক্ষোভকারীর ওপর তারা হামলা চালায়। এ সময় হামাস যোদ্ধাদের কারো হাতে অস্ত্র এবং কারো হাতে লাঠি ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, গাজার উত্তরাঞ্চলীয় বিত লাহিয়ায় তরুণ বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের হামাসের সমালোচনা করে নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়। অনেকে স্লোগান দিচ্ছিলেন, ‘চলে যাও’, ‘চলে যাও’, ‘চলে যাও’, ‘হামাস চলে যাও’। বিক্ষোভের ব্যাপারে হামাসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। ইসলামিক জিহাদের যোদ্ধারা ইসরাইলে রকেট হামলা চালানোর এক দিন পর উত্তর গাজায় এই বিক্ষোভ হয়েছে। ওই হামলার পর ইসরাইলি বাহিনী বিত লাহিয়া ছেড়ে যেতে সেখানকার বাসিন্দাদের নির্দেশ দিয়েছে। এর পরই সেখানকার বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।