ইউরোপে অর্ডারও কম দামেও কষাকষি

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ার আগেই চাপে পোশাক রফতানিকারকরা

মার্কিন বাজারে অনিশ্চয়তা এবং অর্ডার স্থগিত হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় ক্রেতারা এটিকে কাজে লাগিয়ে পোশাকের দর কমানোর চাপ দিচ্ছেন।

শাহ আলম নূর
Printed Edition
Garment

বাংলাদেশের তৈরী পোশাক খাত বর্তমানে বহুমুখী চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কার্যকরের আগেই মার্কিন বাজারে অর্ডার কমে গেছে। ফলে অনেক রফতানিকারক ইউরোপের দিকে ঝুঁকলেও, সেখানেও ক্রেতারা দামের ব্যাপারে কড়া অবস্থান নিচ্ছেন।

পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, মার্কিন বাজারে অনিশ্চয়তা এবং অর্ডার স্থগিত হওয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিকল্প খোঁজা হচ্ছে। তবে ইউরোপীয় ক্রেতারা এটিকে কাজে লাগিয়ে পোশাকের দর কমানোর চাপ দিচ্ছেন।

জায়ান্ট গ্রুপের পরিচালক এস এম মজিদুর রহিম জানান, “যুক্তরাষ্ট্র থেকে অর্ডারের হার প্রায় ৫০ শতাংশ কমেছে। ইউরোপীয় ক্রেতাদের দিকে ঝুঁকলেও তারাও কম দাম প্রস্তাব করছেন। শুল্কের দায় একতরফাভাবে আমাদের ওপর চাপানো একেবারেই অযৌক্তিক।”

তিনি আরো বলেন, “১ আগস্ট থেকে ৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও মার্কেট এরইমধ্যে চাপে পড়েছে। অনেক ক্রেতা অগ্রিমভাবে দামের পুনর্মূল্যায়ন করছে।”

বড় ব্র্যান্ড যেমন হ্যান্ডএম ও ইনডিটেক্স ইতোমধ্যেই তাদের অর্ডার ১০-২০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকারক দুই হাজার ৩৭৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৮০১টির ৫০ শতাংশের বেশি রফতানি মার্কিন বাজারনির্ভর-তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ফতুল্লা অ্যাপারেলসের সিইও ফজলে শামীম এহসান জানান, “নেদারল্যান্ডসের এক ক্রেতা প্রতি ইউনিটের দাম তিন ডলার থেকে ২৫-৩০ সেন্ট কমাতে চাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে। এ জন্যই আমাদের একটি ৭.৫ লাখ ডলারের অর্ডার ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।”

স্প্যারো গ্রুপের এমডি শোভন ইসলাম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে অর্ডার ব্যাহত হলে তার প্রভাব ইউরোপেও পড়ে, কারণ অনেক ক্রেতা এক দেশ থেকে একাধিক গন্তব্যের জন্য পণ্য সংগ্রহ করে।”

এক ইউরোপীয় ব্র্যান্ডের কান্ট্রি ম্যানেজার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি কম থাকলেও মার্কেট ধরে রাখতে বাংলাদেশ থেকে উৎপাদন ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। বিকল্প উৎস ভাবতে হবে।”

পিডিএস গ্রুপের ব্যবসায় উন্নয়ন বিভাগের প্রধান জানান, “আমাদের কিছু ইউরোপীয় ক্রেতা নতুন অর্ডারে দাম কমানোর অনুরোধ করছেন। এমনকি ভারতের বাজারেও অর্ডার কমেছে, অশুল্ক বাধা ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক ঝুঁকি এর অন্যতম কারণ।”

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, “৩৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হলে অনেক মার্কিন ক্রেতা ভিয়েতনাম, ভারত কিংবা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকতে পারেন। শুল্ক যদি আমাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।”

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির ওপর গড় শুল্ক হার ১৫.৫ শতাংশ। নতুন হার কার্যকর হলে তা দাঁড়াবে ৫০.৫ শতাংশে। যা বাংলাদেশকে প্রতিযোগিতামূলক বাজার থেকে অনেকখানি পিছিয়ে দিতে পারে।

এই শুল্ক প্রভাব শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, ইউরোপসহ অন্যান্য রফতানি বাজারেও ছড়িয়ে পড়ছে। অর্ডার কমা ও দামে চাপ আগামী দিনে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় সঙ্কট ডেকে আনতে পারে।

দ্রুত কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ না নিলে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকিতে পড়বে -এমনটাই আশঙ্কা করছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।