অংশগ্রহণ বাড়লেও পুঁজিবাজারের পতন ঠেকানো যায়নি

লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সপ্তাহের শুরুতেই পতনের শিকার হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল রোববার সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে দেশের দুই পুঁজিবাজারই বড় ধরনের পতনের শিকার হয়। লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়া বাজারগুলো একপর্যায়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এক পর্যায়ে হারানো সূচকের একটি বড় অংশ ফিরে পায় বাজারগুলো। এ সময় বাজারে বিনিয়োগকারিদের অংশগ্রহণও বেড়ে যায় যা স্পষ্ট হয়ে ওঠে লেনদেনের গতিতে। কিন্তু সকাল পৌনে ১১টার দিকে বিক্রয়চাপ আরো বেড়ে গেলে দিনশেষে উভয় বাজারেই বড় ধরনের পতন ঘটে। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও ঠেকানো যায়নি পতন ।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিনিয়োগিকারীরা শঙ্কামুক্ত হতে পারছেন না। দেশের অর্থনীতিতে এই যুদ্ধ কতটুকু নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা এখনো স্পষ্ট না হলেও সামনের দিনগুলোতে রফতানি ও রেমিটেন্সসহ নানা ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনিতেই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এরইমধ্যে পুরো বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। দ্রুততম সময়ে যুদ্ধ বন্ধ না হলে সামনে তা আরো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। এসব কারণেই বাজারে বিক্রয়চাপ বাড়ছে। তবে এর মধ্যেও যেটি ইতিবাচক তা হলো লেনদেনের উন্নতি। বিনিয়োগকারিরা বাজারের সাথে থাকতে চান এটাই তার প্রমাণ। তাই বিশ্লেষকদের মতে খুব বেশি শঙ্কার কারণ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিনিয়োগকারীদের আচরণ অনেকটা পরিপক্ব উল্লেখ করে তারা বলেন, সতর্কতার সাথে বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত নেয়া গেলে বড় লোকসান ঠেকানো যাবে।

দেশের প্রধান পুুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪৪ দশমিক ১৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ৩১৬ দশমিক ২৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ২৭২ দশমিক ০৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৩২ ও ৭ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট। অনুরুপভাবে দ্বিতীয পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ১১৪ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট হারায় গতকাল। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসইসিএক্স হারায় যথাক্রমে ১৫৯ ও ৭৪ দশমিক ১০ পয়েন্ট।

দিনের শুরুতে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপের ফলে লেনদেনের প্রথমদিকে বাজার কিছুটা গদি হারালেও দ্রুতই তা কাটিয়ে ওঠে বাজারগুলো। এর ফলে মাত্র আধঘণ্টার মাথায় হারানো সূচকের একটি বড় অংশ ফিরেও পায় দুই বাজার। পরবর্তিতে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি পেলেও বাজার তার স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। এর ফলে দিনশেষে দুই বাজারেই উন্নতি ঘটে লেনদেনের। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৬৪৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৩ কোটি টাকা বেশি। সর্বশেষ দিবসে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৬০৩ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে ২১ কোটি টাকা থেকে লেনদেন পৌঁছে যায় ৩২ কোটি টাকায়।

গতকাল পুঁজিবাজারে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে মতিঝিলে অবস্থিত ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের টেডিং ফ্লোরে উপস্থিত বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নয়া দিগন্তকে বলেন, যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে তারা সচেতন আছেন। তবে এখানে যেহেতু উল্লেখ করার মতো বিদেশী বিনিয়োগ নেই তাই বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সুযোগও নেই। তার পরও দেশের অর্থনীতির সাথে যেহেতু পুঁজিবাজারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে তাই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব কমবেশি বাজারে পড়বে। তবে তারা মনে করেন, যুদ্ধের প্রাথমিক ধাক্কা এর আগেই কাটিয়ে উঠেছে বাজার। তাই নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা থাকলেও তাতে যদি বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হয়ে না পড়েন তাহলে এক পর্যায়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।

এ দিকে সূচকের নেতিবাচক আচরণের মধ্যেও গতকাল ঝুঁকিপূর্ণ শেয়ারেই বিনিয়োগকারীদের বেশি আগ্রহ দেখা যায়। এদিন ডিএসইর লেনদেন ও মূল্যবৃদ্ধি দু’ক্ষেত্রেই প্রাধান্য ছিল দুর্বল কোম্পানির। গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে উঠে অসে একমি পেস্টিসাইডস। কোম্পানিটি গত অর্থবছরে ০ দশমিক ০১ শতাংশ (প্রতি শেয়ারে ১০ পয়সা) নগদ লভ্যাংশ দিয়ে কোনোভাবে ‘বি’ গ্রুপে টিকে আছে। বিগত দুই প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান গুনতে হয়েছে ৩০ পয়সা। এরি মধ্যে গত এক মাসে কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে ৪০ শতাংশের বেশি। কোম্পানিটির আইপিও ফান্ডের অব্যবস্থাপনা নিয়েও নিয়ন্ত্রক সংস্থা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

এ ছাড়া লেনদেনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি ওরিয়ন ইনফিউশন ‘এ’ গ্রুপে লেনদেন হলেও কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয়ের সাথে শেয়ারদর কোনোভাবেই যৌক্তিক পর্যায়ে পড়ে না। গতকাল কোম্পানিটির সর্বশেষ দর ছিল ৩৪৩ টাকা। অথচ গত দুই প্রান্তিকে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ১ দশমিক ১৬ টাকা। ডিএসই থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে গতকাল ওরিয়ন ইনফিউশনের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই) ছিল ১৯৯। সাধারণত ৪০ পিইর কোম্পানিকে আমাদের পুঁজিবাজারে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। এমনকি লেনদেনের শীর্ষ দশের তালিকায় উঠে আসা আরেক কোম্পানি ফাইন ফুডসের পিই গতকাল ছিল ১১২ দশমিক ৫৯। এ তালিকায় থাকা আরেক কোম্পানি ডমিনেজ স্টিলের দু’টি ইউনিটের মধ্যে একটি মোটামুটি চালু থাকলেও অন্যটি দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ। গত বছর বিএসইসির নির্দেশে ডিএসইর একটি টিম কোম্পানিটি পরিদর্শনের পর এই রিপোর্ট দেয়। ২০২০ সালে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটি এক বছরের মাথায়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। বিগত দুই অর্থবছরে যথাক্রমে দশমিক ২৫ ও দশমিক ৩৫ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়ে কোনভাবে ‘বি’ গ্রুপে টিকে আছে। কিন্তু গত তিন মাসের ও কম সময়ে কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে প্রায় ১৭০ শতাংশ।

সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থা ছিল গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানিটির। মূল্যবৃদ্ধিতে দিনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বিডি অটোকারস। গতকাল কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯১ শতাংশ। গত বুধবার সর্বশেষ কর্মদিবসে ১৬৬ টাকার লেনদেন হওয়া কোম্পানিটি গতকাল ১৮৫ টাকার লেনদেন শেষ করে। অথচ গত দুই প্রান্তিকে কোম্পানিটির আয় ছিল শেয়ারপ্রতি ৫ পয়সা। ডিএসই ওয়েবসাইটে পাওয়া তথ্য অনুসারে গতকাল কোম্পানিটির পিই ছিল ১০২৮ দশমিক ৩৩।