কবরস্থান ধ্বংসে শোকের মাত্রা আরো গভীর হচ্ছে গাজাবাসীর
Printed Edition
- রাফাহ সীমান্তে ইসরাইল-মিসর বিরোধ
- টিকটক থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক
- পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ অভিযান জোরদার
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
গাজার তুফাহ এলাকায় আল-বাতশ কবরস্তান খুঁড়ে ফেলছে ইসরাইলি সেনারা। এতে শোকের মাত্রা আরো গভীর হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের। এ কবরস্তানে ফাতিমা আবদুল্লাহর স্বামীসহ হাজারো মানুষের লাশ শায়িত ছিল। সেনারা বন্দী ইসরাইলি পুলিশ রানের লাশ উদ্ধারের নামে প্রায় ২৫০টি কবর খুঁড়ে ফেলে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
ফাতিমা বলেন, আমরা সবাই আতঙ্কে ছিলাম। আমি কল্পনা করছিলাম আমার স্বামীর কবরের দিকে যন্ত্র এগোচ্ছে। তিনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় নিহত হন। ফাতিমার ভাষ্য, মৃতদেরও রেহাই দেয়া হয়নি। কবরগুলো বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে, লাশ ছড়িয়ে গেছে। অক্টোবর ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতির পরও কবরস্তানে যাওয়া সম্ভব হয়নি, কারণ এলাকা ইসরাইলি সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। ফাতিমা বলেন, আমরা শোক করার সুযোগও পেলাম না, এখন প্রিয়জনদের কবরও নেই।
ইসরাইলের কবরস্তান ধ্বংসের ইতিহাস
মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনারা গাজায় অন্তত ২১টি কবরস্তান ধ্বংস করেছে। এতে হাজারো পরিবার প্রিয়জনদের লাশের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছে। ধ্বংস হওয়া কবরস্তানের মধ্যে রয়েছে বেইত হানুন, আল-ফালুজা, শেখ রাদওয়ান, খান ইউনিস ও আল-শুহাদা কবরস্তান। ইউরো-মেড মানবাধিকার মনিটর জানিয়েছে, কবর খুঁড়ে লাশ মিশিয়ে ফেলা বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তারা আন্তর্জাতিক হস্তেেপর আহ্বান জানিয়েছে। হামাসও এ ঘটনাকে অনৈতিক ও বেআইনি বলে নিন্দা করেছে।
বিদায়হীন কবর : ম্যাডেলিন শুকায়লাহ জানান, তার বোন মারাম ও চার মাস বয়সী ভাগ্নি ইউমনা ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়ে আল-বাতশ কবরস্তানে দাফন হয়। পরে কবর খুঁড়ে ফেলার ঘটনায় তারা আবারো শোকাহত হয়েছেন। পরিবার জানে না তাদের লাশের কী হয়েছে। জাতিসঙ্ঘও জানিয়েছে, গাজায় বহু কবরস্তান ধ্বংস হয়েছে। ২০২৪ সালে আল-শিফা ও নাসের হাসপাতালে গণকবর পাওয়া যায়, যেখানে শত শত লাশ ছিল।
কবরহীন শোক : রোলা আবু সিদোর বাবার কবরও ইসরাইলি সেনারা বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করে। তার বাবা অসুস্থ অবস্থায় গাজা শহরে মারা যান। পরিবার পরে জানতে পারে, কবরস্তানের জায়গা মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। রোলা বলেন, আমরা খুঁড়ে দেখেছি, কিন্তু কোনো লাশ পাইনি। আজও জানি না বাবার লাশ কোথায়। তিনি বলেন, আমাদের প্রিয়জনদের জীবিত অবস্থায় কেড়ে নেয়া হয়েছে, এখন মৃত্যুর পরও বিদায় জানানোর সুযোগ নেই।
রাফাহ সীমান্তে ইসরাইল-মিসর বিরোধ
গাজার রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে খুলে দেয়ার প্রস্তুতি চললেও ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে নতুন বিরোধ দেখা দিয়েছে। ইসরাইল চাইছে সীমান্ত দিয়ে যতজন বের হবে তার চেয়ে কম মানুষ যেন ফিরে আসে। গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ইসরাইলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় অনেকেই চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে চান। কেউ পরিবারে যোগ দিতে চান, কেউ পড়াশোনা চালিয়ে নিতে চান। খবর আলজাজিরার। ইসরাইলি গণমাধ্যম জানিয়েছে, আলোচনায় ইসরাইল শর্ত দিয়েছে, গাজা থেকে বের হওয়া মানুষের সংখ্যা ফেরত আসা মানুষের চেয়ে বেশি হতে হবে। মিসর এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। কায়রোর আশঙ্কা, ইসরাইল এভাবে গাজার জনসংখ্যা কমিয়ে দিতে চাইছে। নর্থ সিনাইয়ের গভর্নর খালেদ মেগাওয়ার জানিয়েছেন, মিসর সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তবে ইসরাইল যে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চাইছে তা জনসংখ্যা বাছাইয়ের উদ্দেশ্যে তৈরি।
ভিন্ন নিয়মে প্রবেশ ও প্রস্থান : ইসরাইলি সূত্র জানিয়েছে, গাজা থেকে বের হতে চাইলে ২৪ ঘণ্টা আগে শিন বেত নিরাপত্তা সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। তবে প্রক্রিয়া দুই দিকেই আলাদা। গাজা ছাড়ার সময় ইসরাইল সরাসরি উপস্থিত থাকবে না। ক্যামেরায় মুখ শনাক্ত করে দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে সাথে সাথে গেট বন্ধ করে দেয়া হবে। কিন্তু গাজায় ফেরার সময় প্রক্রিয়া কঠোর। ফেরত আসা মানুষকে ইসরাইলি সেনাদের চেকপোস্টে শরীর তল্লাশি, এক্স-রে স্ক্যান ও বায়োমেট্রিক যাচাইয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
টিকটক থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক
এমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি সাংবাদিক বিসান ওউদা জানিয়েছেন, তাকে স্থায়ীভাবে টিকটক থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিনিয়োগকারীদের হাতে প্ল্যাটফর্মটির নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই এ ঘটনা ঘটল বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। গাজায় অবস্থানরত ওউদা বুধবার ইনস্টাগ্রাম ও এক্সে ভিডিও বার্তায় জানান, তার ১৪ লাখ অনুসারী থাকা টিকটক অ্যাকাউন্ট মুছে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চার বছর ধরে এ প্ল্যাটফর্মে কাজ করেছি। ভেবেছিলাম আগের মতো সীমিত করা হবে, কিন্তু এবার স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হলো। আল-জাজিরা জানিয়েছে, তাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ায় একই নামে একটি অ্যাকাউন্ট দেখা গেলেও মধ্যপ্রাচ্যে তা আর দৃশ্যমান নয়। ওউদা তার ভিডিওতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং টিকটকের নতুন মার্কিন প্রধান অ্যাডাম প্রেসারের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে এ নিষেধাজ্ঞার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। নেতানিয়াহু গত বছর নিউ ইয়র্কে প্রো-ইসরাইল প্রভাবশালীদের সাথে বৈঠকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখন যুদ্ধেেত্রর সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তিনি টিকটক কেনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। টিকটক সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আলাদা সংস্করণ চালু হয়েছে, যা দেশটির বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এর মধ্যে কয়েকটি কোম্পানি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সংশ্লিষ্ট।
অ্যাডাম প্রেসারের এক ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি বলেন, ‘জায়নিস্ট’ শব্দকে ঘৃণাত্মক বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘৃণাত্মক প্রবণতা ঠেকাতে প্ল্যাটফর্মে কঠোর নজরদারি চলছে। ওউদার জনপ্রিয়তা বেড়েছিল প্রতিদিনের ভিডিওতে তার অভিবাদন দিয়ে ‘ইটস বিসান ফ্রম গাজা, অ্যান্ড আই’ম স্টিল অ্যালাইভ।’ এ নামেই তিনি একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন, যা ২০২৪ সালে এমি পুরস্কার পায়। তার ভিডিও প্রকাশের দিনই ইসরাইলের শীর্ষ আদালত আবারো বিদেশী সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত করে। এদিকে চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেও গত সপ্তাহে ইসরাইলি হামলায় তিন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক নিহত হন। সাংবাদিক সুরা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০৭ ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।
পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ অভিযান জোরদার
পূর্ব জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের দণি দিকে অবস্থিত সিলওয়ান থেকে ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করে সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের জোর তৎপরতা চালাচ্ছে ইসরাইল। ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এই এলাকার ৩২টি ফিলিস্তিনি পরিবারকে আগামী মার্চের মাঝামাঝি অর্থাৎ রমজান মাসের শেষ নাগাদ ঘরবাড়ি ছাড়ার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। আদালতের নির্দেশনামা রয়টার্সকে দেখিয়েছেন সিলওয়ানের এক বাসিন্দা কায়েদ রাজাবি। তিনি জানান, তাকে এবং তার প্রতিবেশী পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের এই নোটিশ দেয়া হয়েছে। তাদের ভিটেমাটি এখন জেরুসালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনের কাজ করে আসা ইহুদি সংগঠন ‘আতেরেত কোহানিম’-এর হাতে তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ওই এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪০টি ভবন দখল করে বড় বড় ইসরাইলি পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ভবনগুলো ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের দখলে থাকার চিহ্ন হয়ে আছে এসব পতাকা। কায়েদ রাজাবি বলেন, তার পরিবার ১৯৬৭ সাল থেকে সিলওয়ানের বাড়িতে বাস করছে এবং এক জর্দানি কর্মকর্তার কাছ থেকে এই জমি কেনা হয়েছিল। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘যে বাড়িতে আমি জন্মেছি, যে বাড়িতে প্রথম চোখ মেলেছি, সেখান থেকে আজ আমাকে জোর করে বের করে দেয়া হচ্ছে।’
অন্যদিকে, ইহুদি সংগঠন আতেরেত কোহানিম-এর নির্বাহী পরিচালক ড্যানিয়েল লুরিয়া সিলওয়ানে বাস করা ফিলিস্তিনিদের ‘অবৈধ দখলদার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, ১৯২৯ সালের আগে এই জমির মালিক ছিল ইয়েমেনি ইহুদিরা এবং সেখানে আবার তাদেরকে ফিরিয়ে আনা ঐতিহাসিক একটি অন্যায় সংশোধন করার শামিল। তবে উচ্ছেদ নোটিশ পাওয়া ফিলিস্তিনি বাসিন্দা রাজাবি এই দাবিকে মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।