কাঠামোগত সঙ্কটে অর্থনীতি

রেমিট্যান্স ও রফতানির স্বস্তির সমান্তরালে খেলাপি ঋণ ও বেসরকারি ঋণের খরা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি বর্তমানে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। একদিকে প্রবাসী আয় ও রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের গভীর সঙ্কট, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৮ জুন ২০২৬ প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাহ্যিক স্থিতিশীলতা অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতাকে আড়াল করতে পারছে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। গত বছরের একই সময়ের ২২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও, প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ও বৈদেশিক দায় বিবেচনায় চাপ পুরোপুরি দূর হয়নি।

ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রলিং পেগ ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার ব্যবস্থার ফলে আন্তঃব্যাংক ডলারের বিনিময় হার প্রায় ১২২ দশমিক ৭৭ টাকায় স্থিতিশীল হয়েছে। এটি আমদানিকারকদের জন্য ইতিবাচক হলেও, দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিযোগিতামূলক রফতানি সক্ষমতা বজায় রাখা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকিং খাতের গভীর ক্ষত : রেকর্ড খেলাপি ঋণ

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো ব্যাংকিং খাতের অবনতিশীল স্বাস্থ্য। দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের ফলে খেলাপি ঋণ এখন কাঠামোগত সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সাময়িক হিসাবে মোট খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশে, যা ২০২৪ সালের মার্চে ছিল ১১ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিতরণকৃত প্রতি ১০০ টাকার ঋণের প্রায় ৩২ টাকাই এখন ঝুঁকিপূর্ণ বা আদায় অনিশ্চিত।

প্রভিশন সমন্বয়ের পর নিট খেলাপি ঋণের হারও ১৫ দশমিক ০১ শতাংশ, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত উচ্চ।

এত বিপুল পরিমাণ অবরুদ্ধ সম্পদ ব্যাংকগুলোর নতুন ঋণ প্রদানের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করছে। ফলে অর্থনীতির উৎপাদনশীল খাতগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সরকারি ঋণের চাপ ও বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্কট

অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত বেসরকারি খাত বর্তমানে তীব্র ঋণ সঙ্কটের মুখে রয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৩৭ শতাংশ। বিপরীতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি একটি ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট-এর স্পষ্ট উদাহরণ। অর্থাৎ, সরকার যখন ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ করে, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যায়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে নতুন শিল্পায়ন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য একটি সতর্ক সঙ্কেত, যা ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

বাহ্যিক খাতে স্বস্তি : রেমিট্যান্স ও রফতানির ইতিবাচক প্রবণতা

অন্যদিকে, দেশের বাহ্যিক খাত এখনো অর্থনীতির প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে কাজ করছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।

একই সময়ে রফতানি আয় ৭ দশমিক ৭২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে ৪৩ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে যাওয়া উদ্বেগের কারণ। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো- শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও কমেছে, যা ভবিষ্যৎ শিল্প উৎপাদন ও রফতানি সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি কমে যাওয়া সবসময় ইতিবাচক নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি বিনিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রমের স্থবিরতার ইঙ্গিত বহন করে।

মূল্যস্ফীতির অনড় চাপ ও প্রবৃদ্ধির মন্থরতা

সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে মূল্যস্ফীতি। ২০২৬ সালের মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে। ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতিও ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঊর্ধ্বমুখী সুদের হার এবং বিনিয়োগের দুর্বলতার ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও মন্থর হয়ে পড়েছে। সাময়িক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি হলেও কোভিড-পূর্ববর্তী ৭-৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির তুলনায় অনেক নিচে।

অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সূচকগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরছে- দেশের অর্থনীতি বর্তমানে “বাহ্যিক খাতের স্থিতিশীলতা বনাম অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সঙ্কট”-এর দ্বন্দ্বে আটকে আছে।

রেমিট্যান্স ও রফতানি আয় সাময়িক স্বস্তি দিলেও, খেলাপি ঋণের বিস্ফোরণ, বেসরকারি খাতে ঋণ সঙ্কোচন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সরকারি ঋণনির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে। বিশেষ করে, যদি বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতি পুনরুদ্ধার না হয়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উৎপাদনশীলতা উভয়ই চাপের মুখে পড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য তিনটি ক্ষেত্রকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে- ১. ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার ও গভীর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার; ২. সরকারের ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি; ৩. বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন সম্প্রসারণে ঋণপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা। অন্যথায়, বাহ্যিক খাতের বর্তমান সাফল্যও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোর গভীর সঙ্কটকে দীর্ঘমেয়াদে আড়াল করতে পারবে না।