চা বাগানের দূত‘নীলকণ্ঠ পাখি’
Printed Edition
এম এ রকিব শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
ইন্ডোচাইনিজ রোলার (ঈড়ৎধপরধং ধভভরহরং), যা স্থানীয়ভাবে ‘নীলকণ্ঠ পাখি’ বা বার্মিজ রোলার নামে পরিচিত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দৃষ্টিনন্দন আবাসিক পাখি। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ পাখিকে থোড়মোচা, কেওয়া, নীলাচল, নীলাঘুঘু ও নীলকবুতর নামেও ডাকা হয়।
জানা যায়, পাখির প্রধান বৈশিষ্ট্য এর পালকের উজ্জ্বল নীল রঙ। দেহের বিভিন্ন অংশে গাঢ় ও হালকা নীলের সংমিশ্রণ দেখা যায়। ডানায় বেগুনি ও বাদামি আভা থাকায় উড়ন্ত অবস্থায় পাখিটি আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। সাধারণত এদের দৈর্ঘ্য ২৬-৩৩ সেন্টিমিটার এবং ওজন হয়ে থাকে ১৬০-১৭৫ গ্রাম পর্যন্ত। নীলকণ্ঠ সাধারণত গাছের উঁচু ডাল বা বৈদ্যুতিক তারে বসে শিকারের জন্য অপেক্ষা করে। শিকার দেখামাত্র ছোঁ মেরে নিয়ে যায়। এদের প্রধান খাদ্য ঘাসফড়িং, পোকামাকড়, ছোট ব্যাঙ ও টিকটিকি।
এদের প্রজনন মৌসুম বসন্ত ও বর্ষাকালে মরা খেজুর, তাল বা নারিকেল গাছের কুঠারে বা গর্তে বাসা তৈরি করে। তবে বর্তমানে এসব গাছ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন চা বাগানের ছায়াবৃক্ষের কোঠরে বাসা বেঁধে ডিম পাড়তে দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ উভয় পাখি মিলে বাসা তৈরি করে। সাধারণত বছরে একবার তিন-চারটি ডিম পাড়ে এবং ১৭ থেকে ২০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। একসময় বাংলাদেশের সিলেট ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও গ্রামাঞ্চলে প্রচুর নীলকণ্ঠ পাখি দেখা মিললেও বর্তমানে এদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
নীলকণ্ঠ পাখি এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃতভাবে দেখা গেলেও ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পূর্ব ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনামে ও বাংলাদেশে এদের উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, ইরাক, ইরান, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতেও এ পাখির দেখা মেলে। বাংলাদেশে সাধারণত খোলা মাঠ, কৃষিজমি ও গ্রামীণ পরিবেশে এদের বেশি দেখা যায়।
পরিবেশকর্মী ও বার্ড ফটোগ্রাফার খোকন থৌনাওজাম নয়া দিগন্তকে জানান, গত ৮ মে শ্রীমঙ্গলের একটি চা বাগানে শিকার ধরে বাচ্চাদের জন্য বাসার দিকে উড়ে যাওয়ার সময় তিনি দৃষ্টিনন্দন এ পাখিটির স্থিরচিত্র ধারণ করেন। এ সময় ছবির কবি খ্যাত পরিবেশকর্মী ও শৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসানও নীলকণ্ঠ পাখির স্থিরচিত্র ধারণ করেন। তিনি বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের পাখির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে খাদ্য ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এই পাখিসহ অনেক আবাসিক প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। বর্তমানে পাখিটি শ্রীমঙ্গলসহ সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন চা বাগানে বেশি দেখা যায়।
খোকন থৌনাওজাম আরো জানান, ভারতে এ পাখিকে ‘নীলকান্ত’ নামে ডাকা হয়। জমিদারি আমলে তৎকালীন জমিদাররা দুর্গাপূজার আগে নীলকণ্ঠ পাখি সংগ্রহ করে পূজার শুরুতে অবমুক্ত করার একটি প্রথা ছিল। এ ছাড়া হিন্দু পৌরাণিক কাহিনীতে এ পাখিকে পবিত্র ও শুভ প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে বিজয়া দশমীর সময় নীলকণ্ঠ পাখি দেখা শুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
তারিক হাসানের ক্যামেরায় চিত্রধারণ করা একটি ছবি তিনি তার ফেসবুকে টাইমলাইনে পোস্ট করে লিখেন, ‘আমার বৌর বেহেশতি পাখি’। তার এই পোস্টে রিয়েক্ট ও মন্তব্য করেন কয়েক শ’ মানুষ। প্রকৃতির এই সুন্দর পাখিটি সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে এ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মী এবং শৌখিন ফটোগ্রাফার তারিক হাসান।