রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন

ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১২শ’ ১৮ কোটি টাকার ক্ষতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
  • গত বছরের চেয়ে প্রাণহানি বেড়েছে ২৯.০৩ শতাংশ
  • ১২ দিনে নিহত ৩১২ জন

ঈদযাত্রায় ৩ জুন থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত (আগে-পরে ১২ দিন) সারা দেশে ৩৪৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন এক হাজার ৫৭ জন। এসব সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১২ শত ১৮ কোটি ৭২ লাখ ৮৬ হাজার টাকার মানবসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। তবে দুর্ঘটনার অনেক তথ্য অপ্রকাশিত থাকায় এরসাথে আরো ৩০ শতাংশ সংযোগ করা যেতে পারে বলে জানায় রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। গতকাল বুধবার রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানান।

তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় প্রাণহানি বেড়েছে ২৯ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ। ফলে এই ১২ দিনে প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২৬ জন। ঈদযাত্রায় একটি পরিবারের সকলেই নিহত হয়েছে। পিতা-পুত্র নিহতের ঘটনা ঘটেছে ছয়টি। স্বামী-স্ত্রী নিহতের ঘটনা ঘটেছে তিনটি এবং মা-ছেলে নিহতের ঘটনা ঘটেছে একটি। কিশোর-যুবকরা বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালিয়ে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হয়েছে। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৪ দশমিক ২০ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর।

রোড সেফটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সময়ে ১২১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১০৭ জন, যা মোট নিহতের ৩৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ছিল ৩৪ শতায়ংশ ৮৭ শতাংশ। দুর্ঘটনায় ৪৪ জন পথচারী, যানবাহনের চালক ও সহকারী নিহত হয়েছেন ৫১ জন। নিহতের মধ্যে নারী ৪৭, শিশু ৬৩। এ ছাড়াও এই সময়ে ৯টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৮ আহত হয়েছেন। ৩২টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১১৬টি দুর্ঘটনায় ৮৭ জন নিহত। শুধু রাজধানী ঢাকায় ৩৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩ জন আহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ১৩টি দুর্ঘটনায় ১৪ জন নিহত।

প্রতিবেদনে দুর্ঘটনায় যানবাহনভিত্তিক নিহতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়- বাস যাত্রী ৩৩ জন, ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ আরোহী ১৮ জন, প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স আরোহী ১১ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান) ৭৩ জন, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের যাত্রী (নসিমন-পাখিভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-বিভাটেক) ২০ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ছয়জন নিহত হয়েছেন।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৯ দশমিক ১৯ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ আঞ্চলিক সড়কে, ৯ দশমিক ৭৯ গ্রামীণ সড়কে এবং ৫৬টি ১৬ দশমিক ১৩ শহরের সড়কে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়াও দুর্ঘটনাগুলোর ৮১টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৬৩টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৪৬টি পথচারীকে চাপা/ধাক্কা দেয়া, ৫১টি যানবাহনের পেছনে আঘাত করা এবং ছয়টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য মতে, দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা ৫৮৯টি। এর মধ্যে বাস ১১৪, ট্রাক ৬৬, কাভার্ডভ্যান ১১, পিকআপ ১২, ট্রাক্টর ৪, ট্রলি ৬, ড্রাম ট্রাক ৭, মাইক্রোবাস ১৭, প্রাইভেট কার ২৯, অ্যাম্বুলেন্স ৩, মোটরসাইকেল ১২৮, থ্রি-হুইলার ১২৬ (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৪১ (নসিমন-পাখিভ্যান-মাহিন্দ্র-টমটম-বিভাটেক), বাইসাইকেল-রিকশা ১৩ এবং অজ্ঞাত যানবাহন ১২টি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, এবারের ঈদে রাজধানী ঢাকা থেকে কমবেশি ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ঘরমুখী যাত্রা করেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। ঈদের আগে ঘরমুখী যাত্রায় ছুটি কম থাকায় একসাথে বহু মানুষের যাত্রার কারণে যানবাহনের ব্যাপক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। সড়কে ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকল হওয়া, দুর্ঘটনায় পতিত হওয়া এবং বৃষ্টিতে সড়ক নষ্ট হওয়ার কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি হয়েছে। চালকরা বিশ্রামহীনভাবে যানবাহন চালানোর কারণে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে এবং সড়কে দাঁড়ানো ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দিয়ে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে। ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পথে পথে যাত্রী হয়রানি চরম পর্যায়ে ছিল।

তিনি আরো বলেন, ঈদের মাত্র চার থেকে পাঁচ দিনে বিপুল সংখ্যক মানুষকে পরিবহন করার মতো মানসম্পন্ন নিরাপদ গণপরিবহন আমাদের নেই। ফলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে গন্তব্যে যাত্রা করেন এবং দুর্ঘটনায় আক্রান্ত হন। আসলে একটি সুস্থ, স্বাভাবিক ও নিরাপদ ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে কমপক্ষে তিন বছরের একটি মধ্যমেয়াদি টেকসই সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনার অধীনে রেললাইন সংস্কার এবং সম্প্রসারণ করে ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে সড়ক পথের মানুষকে ট্রেনমুখী করতে হবে। নদীপথ সংস্কার ও জনবান্ধব করতে হবে। ঈদযাত্রায় পোশাক শ্রমিকরা যাতে পর্যায়ক্রমে ছুটি উপভোগ করতে পারেন সেজন্য পরিকল্পনা সাজাতে হবে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগের সমন্বয় এবং ধারাবাহিকতা নেই। বেশির ভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে সড়ক পরিবহন খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে।