সরকারি ব্যবস্থায় হজযাত্রী বাড়ানোর পরিকল্পনা ধর্ম মন্ত্রণালয়ের

প্রণোদনাসহ নানা উদ্যোগ

Printed Edition

খালিদ সাইফুল্লাহ

আসন্ন মৌসুমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রী বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। অন্তত চার ভাগের একভাগ হাজী সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাঠাতে চায় মন্ত্রণালয়। এজন্য প্রণোদনাসহ নানা উদ্যোগ হাতে নেয়া হয়েছে।

এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে হাজীরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় বেশি গেলেও বাংলাদেশে এর বিপরীত। দেশে প্রতি বছর যত সংখ্যক হাজী যাচ্ছেন তার মাত্র ১০ ভাগের একভাগও সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন না। অধিকাংশ হাজীই যাচ্ছেন বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে। অথচ এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক দুই লাখ ২১ হাজার ব্যক্তি পবিত্র হজ পালনে যান। এর মধ্যে দুই লাখ ১০ হাজার তথা ৯৫ ভাগ হজযাত্রীই সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যান। মাত্র ১১ হাজার তথা ৫ ভাগ হজযাত্রী সৌদি যান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়। একইভাবে ভারত থেকে ৫০ ভাগ সরকারি ব্যবস্থাপনায় এবং পাকিস্তান থেকে ৭০ ভাগ হজযাত্রী সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজে যান। দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ থেকে সরকারি ব্যবস্থাপনায় খুবই কম সংখ্যক হাজী যাচ্ছেন। বাংলাদেশের হজযাত্রীর মোট কোটা এক লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর এ কোটা আর পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। গত কয়েক বছরে দেশের হজযাত্রীর নির্ধারিত কোটা পূরণ হয়নি। গত ২৬ মে অনুষ্ঠিত হজে দেশ থেকে মোট ৭৮ হাজার ৫০০ জন পবিত্র হজ পালনে যান। এর মধ্যে শুধু বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেই যান ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় যান মাত্র চার হাজার ৫৬৫ জন, যা বেসরকারি এজেন্সির হাজীর তুলনায় ১৬ ভাগের এক ভাগ মাত্র।

এ বছরের হজে সরকার দায়িত্ব নিয়েই ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে। ফলে মূল ব্যবস্থাপনা আগের সরকারের সময়েই সম্পন্ন হয়ে যায়। সেজন্য এ বছর তেমন কোনো পরিবর্তন করতে পারেনি সরকার। তবে ওই সময় ধর্মমন্ত্রী আগামী হজে সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজযাত্রী বাড়ানোর ঘোষণা দেন। এরপর পরিকল্পনা শুরু হয়। সম্প্রতি এ নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ে একাধিক মিটিং করেছেন কর্মকর্তারা। সর্বশেষ জানা যায়, মন্ত্রণালয় আগামী হজে মোট হজযাত্রীর ২৫ ভাগ সরকারি ব্যবস্থাপনায় নেয়ার পরিকল্পনা করেছে। এজন্য প্রণোদনা প্রদান, টিমে অন্তর্ভুক্তি, হজ পালনের সুযোগ ও পুরস্কার দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিজস্ব ইউজার আইডিতে হজযাত্রী সংগ্রহের ভিত্তিতে নির্বাচিত হজ গাইডদের সৌদি আরব যাওয়ার সময় আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে। ৪০ জন বা তার বেশি হজযাত্রী সংগ্রহ করলে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা, ৩০ থেকে ৩৯ জন সংগ্রহ করলে এক লাখ ২০ হাজার টাকা, ২০ থেকে ২৯ জন হলে এক লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ২০ জনের কম হলে এক লাখ টাকা প্রণোদনা পাবেন। এ ছাড়া ধর্ম মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দফতর-সংস্থার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজস্ব আইডিতে ১০০ জনের বেশি হজযাত্রী নিবন্ধন করাতে পারলে হজ টিমে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। এ ছাড়া সরকারি মাধ্যমে সর্বোচ্চ হজযাত্রী নিবন্ধিত ১৫টি জেলা থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাঠ পর্যায়ের একজন করে কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে বিভিন্ন টিমের সদস্য হিসেবে সৌদি আরবে পাঠানো হবে। এ ছাড়া ২০২৭ সাল থেকে হজ গাইডদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ভিত্তিতে অন্তত ১০ জনকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার ও সম্মাননা স্মারক দেয়া হবে। একইভাবে যারা ৩০ জন বা তার বেশি হজযাত্রী সংগ্রহ করেও হজ গাইড, টিম সদস্য বা হজ পালনের সুযোগ নিতে চান না, তাদেরও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার ও সম্মাননা দেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়।

প্রচার বৃদ্ধি : সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ধর্মমন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে ‘হজ সেবা ডেস্ক’ স্থাপন এবং সারা দেশের মডেল মসজিদের দৃশ্যমান স্থানে ব্যানার প্রদর্শন, প্রতিটি ইউনিয়নে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ৩-৪ জন কেন্দ্র শিক্ষক-ইমামকে সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী সংগ্রহ করার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দায়িত্ব প্রদান, সোনালী ব্যাংক পিএলসির সব শাখায় ‘হজ সেবা ডেস্ক’ স্থাপন ও হজযাত্রী নিবন্ধন সংক্রান্ত ব্যানার প্রদর্শন, ‘সহজ ও নিরাপদ হজ’ শিরোনামে দুই লাখ ৫০ হাজার হজ বিষয়ক সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ, বিকাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সব এজেন্টের দোকান-ডেস্কের দৃশ্যমান স্থানে ‘হজ সেবা ডেস্ক’ ও হজযাত্রী নিবন্ধন বিষয়ক ব্যানার প্রদর্শন, মসজিদের প্রাক-খুতবায় আলোচনার ব্যবস্থা করা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়াধীন জেলা তথ্য অফিসের উদ্যোগে সড়ক প্রচার-মাইকিং ও ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, যেসব জেলাতে সরকারি মাধ্যমে হজযাত্রী অপেক্ষাকৃত কম হয় এরূপ জেলাগুলোতে মতবিনিময় সভা আয়োজন, বিভাগীয় পর্যায়ে হজ মেলার আয়োজন, সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সরকারি মাধ্যমে হজ বিষয়ক বিশেষ টকশো-আলোচনা সভার আয়োজন, পত্রিকায় বিষয়ভিত্তিক ফিচার লেখা-প্রকাশের ব্যবস্থা করা, সংবাদ সম্মেলন করা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে বুস্টিং করা, মোবাইলে খুদে বার্তা প্রেরণ এবং টিভি চ্যানেলের স্ক্রলে প্রচার অন্যতম।

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ নয়া দিগন্তকে বলেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় হাজীরা বিভিন্ন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভালো সেবা পাচ্ছেন হাজীরা। এ জন্য এবার অন্তত চার ভাগের এক ভাগ হাজী সরকারি ব্যবস্থাপনায় নিতে চায়।