আ’লীগ সরকারের অনুমোদিত ৯ ব্যাংকের নথি তলব

ফেঁসে যাচ্ছেন সাবেক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর

ব্যাপক অনিয়ম ও রীতিনীতি অমান্য করে লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। আর এ সময়ে গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ড. আতিউর রহমান ও ডেপুটি গভর্নর সিতাংসু কুমার সুর চৌধুরী।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition
বাংলাদেশ ব্যাংক

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের অনুমতি দেয়া ৯ ব্যাংকের নথি তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ব্যাংকগুলোর অনুমোদন সংক্রান্ত নোটশিটসহ নথি, পরিপত্র বা প্রজ্ঞাপনসংক্রান্ত যাবতীয কাগজ আগামী ২৫ জুনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংককে জমা দিতে বলা হয়েছে। ব্যাপক অনিয়ম ও রীতিনীতি অমান্য করে লাইসেন্স দেয়া হয়েছিল ব্যাংকগুলোকে। আর এ সময়ে গভর্নর হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ড. আতিউর রহমান ও ডেপুটি গভর্নর সিতাংসু কুমার সুর চৌধুরী। ২০১৩ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো হলো- মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও দি ফার্মার্স ব্যাংক। সংশ্লিষ্ট সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২০১২ সালের শেষ দিকে, নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিতে দাতা সংস্থা আইএমএফ, সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ এবং খোদ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল তা দেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বেশি ছিল। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত ২০০১ সালে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হবে না। এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপিসহ চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-২০০৬) কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন কোনো ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়নি। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পরই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু বাধসাধে বাংলাদেশ ব্যাংক। তখন অর্থনৈতিক পেক্ষাপট বিবেচনা না করেই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ঘোষণা করেন, সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন ব্যাংক দেবে। এ জন্য গত ২০১১ সালের ৪ জুলাই নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশনা দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে চিঠি দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা আসার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই দিন থেকেই কার্যক্রম শুরু করে। তবে ওই বছরের ২৪ আগস্টের পরিচালনা পর্ষদের সভায় ‘বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত : একটি পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন পেশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বলা হয় প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার আয়তন, জনসংখ্যার ঘনত্বের তুলনায় বাংলাদেশে নতুন ব্যাংক দেয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারলেও ওই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেযার অনুমতি দেয় পর্ষদ। ২৭ সেপ্টেম্বর শর্তসাপেক্ষে বেসরকারি খাতে নতুন ব্যাংকের আবেদন আহ্বান করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দিষ্ট সময়ে অফেরতযোগ্য ১০ লাখ টাকার জামানতসহ তিনটি এনআরবি এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ৩৭টি আবেদন জমা পড়ে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল প্রবাসী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে তিনটি এবং ৮ এপ্রিল দেশীয় উদ্যোক্তাদের অর্থায়নে ছয়টিসহ মোট ৯টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দেয় পর্ষদ। ৪০০ কোটি টাকার মূলধনসহ লাইসেন্সের আবেদন করতে ১৭ এপ্রিল প্রস্তাবিত এসব ব্যাংকের নামে সম্মতিপত্র বা এলওআই ইস্যু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন ব্যাংক পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক দেয়া শর্তের মধ্যে অন্যতম ছিল ৪০০ কোটি টাকার সাদা টাকা জমা দিতে হবে। অর্থাৎ যে আয়ের কর দেয়া হয়েছে ওই টাকা হতে হবে। যারা ব্যাংকের পরিচালক হবেন তারা কর খেলাপি বা ঋণখেলাপি হতে পারবেন না। একজন উদ্যোক্তা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করতে পারবেন। সে অনুযায়ী ৪০০ কোটি টাকার মূলধনের জন্য ২০ জন পরিচালক হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আবেদনপত্রগুলো ২০১২ সালের ১৭ অক্টোবর থেকে বাছাই শুরু হয়। প্রস্তাবিত ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তাদের দেয়া আবেদনপত্র যাচাই-বাছাইকালে তিনটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে অন্যতম হলো উদ্যোক্তাদের জমা দেয়া অর্থ বৈধ কি না। এ জন্য আবেদনের সাথে জমা দেয়া উদ্যোক্তাদের আয়কর সার্টিফিকেট নিয়ে তারা সরাসরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে যান। তাদের আয়কর বিবরণীগুলো মিলিয়ে দেখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী জমা দেয়া অর্থ বৈধ না হলে ওই ব্যক্তি পরিচালক হতে পারবেন না।

দ্বিতীয়ত, উদ্যোক্তারা ঋণ বা কর খেলাপি কি না। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) রক্ষিত ঋণ তথ্য খতিয়ে দেখা হয়। একই সাথে কর খেলাপি কি না তা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে যাচাই-বাছাই করা হয়। তৃতীয়ত, ব্যাংকে উদ্যোক্তারা যে অর্থ জমা দিয়েছে, তা ব্লকড করা হয়েছে কি না। কেননা ব্যাংকে উদ্যোক্তারা মূলধন হিসেবে যে অর্থ জমা দিয়েছেন তা ব্লকড করা না হলে তারা যেকোনো সময় উত্তোলন করে নিয়ে যাবেন। আর ব্লকড করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া অর্থ উত্তোলন করা যাবে না। যখন ব্যাংক কোম্পানি গঠন হয়ে যাবে, তখন জমা দেয়া অর্থ মূলধন হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসেবে স্থানান্তর হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসঙ্গতি পাওয়া যায়। পরবর্তীতে অসঙ্গতিগুলো দূর করার জন্য উদ্যোক্তাদের ডেকে তা সংশোধন করা হয়। ক্ষেত্রবিশেষ ১০ বারও সংশোধন করা হয়েছিল। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরকার দলীয়-সমর্থকদের ব্যাংক দিবে এ ধরনের নির্দেশনা ছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। তাই কাগজপত্রে অসঙ্গতি রেখে ব্যাংকের লাইসেন্স দিলে সরকার পরিবর্তন হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ফেঁসে যেতে পারেন। নিজেদের স্বচ্ছতা বজায় রাখার স্বার্থেই কাগজপত্রে অসঙ্গতি দূর করা হয়। এর পরেও অনেক ঋণখেলাপি, করখেলাপি ব্যাংকের লাইসেন্স পেয়ে যান বিশেষ বিবেচনায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক-সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন ডেপুটি গভর্নর সিতাংসু কুমার সুর ও তার কয়েকজন বিশ্বস্ত কর্মকর্তা। যেহেতু পতিত সরকারের মন্ত্রী, আমলা ও সরকার দলীয় নেতাকর্মীদের ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয় সেজন্য বিশেষ বিবেচনায় অনেক কিছুই গোপন করা হয় শর্ত পরিপালনের ক্ষেত্রে। এসব বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য দুদক থেকে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি চিঠি দিয়েছে। ব্যাংকগুলোর অনুমোদনের ক্ষেত্রে নোটশিটসহ যাবতীয় নথি দুদকে আগামী ২৫ জুনের মধ্যে জমা দিতে চিঠিতে অনুরোধ করা হয়েছে।