কেরুর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়নি মিলে আখ সঙ্কটের শঙ্কা

Printed Edition
bangla-1
খামারের একটি আখ ক্ষেত : নয়া দিগন্ত

এফ এ আলমগীর, চুয়াডাঙ্গা

চুয়াডাঙ্গার দর্শনা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকলে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ আখ রোপণ মৌসুমে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। গত আট বছরে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকে নামিয়ে আনার পরও তা অর্জিত না হওয়ায় দেশের অন্যতম বৃহৎ এই রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চিনিকল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে মোট ছয় হাজার একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে কোম্পানির নিজস্ব খামারে এক হাজার ৬৩৫ একর জমিতে এবং চাষিদের চার হাজার ৩৬৫ একর জমিতে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল। বাস্তবে কোম্পানির খামারে নতুন আখ রোপণ করা হয়েছে এক হাজার ৫০৩ একর এবং মুড়ি আখ ১৩৫ একরসহ মোট এক হাজার ৬৩৮ একর জমিতে। অন্যদিকে চাষিদের জমিতে নতুন আখ হয়েছে দুই হাজার ৫২২ একর এবং মুড়ি আখ এক হাজার ৬৪২ একরসহ মোট চার হাজার ১৬৪ একর জমিতে। সব মিলিয়ে ছয় হাজার একরের বিপরীতে আখ রোপণ হয়েছে পাঁচ হাজার ৮০২ একর- যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২০০ একর কম।

পরিসংখ্যান বলছে, মাত্র আট বছর আগে ২০১৭-১৮ মৌসুমে আখ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৫০০ একর। সময়ের ব্যবধানে তা কমতে কমতে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এরপরও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া সংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আখ চাষে আগ্রহ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ফসল হিসেবে আখ চাষে সময় ও ব্যয় বেশি হলেও লাভ তুলনামূলক কম। এর বিপরীতে স্বল্পমেয়াদি ফসল- বিশেষ করে ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি, কম সময়ে বেশি লাভ দিচ্ছে। ফলে কৃষকরা ধীরে ধীরে আখ চাষ থেকে সরে যাচ্ছেন। একই জমিতে বছরে দুই থেকে তিনবার ফসল উৎপাদনের সুযোগ থাকায় আখের মতো দীর্ঘমেয়াদি ফসলের প্রতি অনীহা বাড়ছে।

তাছাড়া বিগত সময় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর যে চাপ ছিল সেটিও বর্তমানে শিথিল হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আগে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বেতন, বার্ষিক প্রবৃদ্ধি বন্ধসহ বিবিধ ব্যবস্থা নেয়ায় তারাও প্রাণপণে চেষ্টা করতেন লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার জন্য। বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে ঢিলেঢালাভাবে কাজ করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। আগে সুগার কর্পোরেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আখ চাষ বাধ্যতামূলক ছিল। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়ি চিনিকল এলাকার বাইরে কিংবা নিজস্ব জমি নেই তারা চাষিদের নিকট হতে চাকরি বাঁচাতে উচ্চমূল্যে হলেও জমি লিজ নিতেন এবং আখ চাষ করতেন। বর্তমানে তা না থাকায় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও খুব একটা মাঠে পাওয়া যায় না।

আরো জানা গেছে, কেরু কোম্পানির প্রধান আয়ের উৎস দেশের একমাত্র ডিস্টিলারি ইউনিট, যার কাঁচামাল চিটাগুড় মূলত আখ থেকেই উৎপন্ন হয়। ফলে আখের সরবরাহ কমে গেলে শুধু চিনিকল নয়, ডিস্টিলারি কার্যক্রমও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন চিনিকলে আখের অভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে।

এ বিষয়ে কেরু কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, ‘লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। অবহেলার অভিযোগ সঠিক নয়। আমি নিজেও মাঠে গিয়ে চাষিদের সাথে কথা বলছি এবং তাদের সমস্যার সমাধানে কাজ করছি।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা পেলে পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।’ তবে স্থানীয়দের মতে, আখ চাষে প্রণোদনা বৃদ্ধি, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর তদারকি জোরদার না করলে এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত আরো সঙ্কটে পড়তে পারে।