পলিটিকো বিশ্লেষণ
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্কট আরো তীব্র
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
ইরানে যুদ্ধ শুরুর এক মাস পর যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নেভাদায় এক গ্যালন গ্যাসের দাম প্রায় পাঁচ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। পেনসিলভানিয়ায় কৃষকরা সারের দাম নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর মিশিগানে, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা উৎপাদন এবং গাড়িশিল্পের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। মার্কিনিরা যুদ্ধটি হয়তো তত দ্রুত শেষ হবে না ভাবলেও সার্বিক পরিস্থিতিতে তাদের দুশ্চিন্তা আক্ষরিক ও রূপক উভয় মূল্যই বেড়েই চলেছে। অবশ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোর রিপাবলিকানরা মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধের পক্ষেই থাকলেও এর পরিণতি উপেক্ষা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রতি সপ্তাহে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথে সাথে আমেরিকানদের কষ্টও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানে উত্তেজনা অবিলম্বে কমিয়েও আনে, তবুও গ্যাসের দাম কয়েক মাস ধরে বেশি থাকতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধির ঝুঁকিও বাড়ায়, বিশেষ করে যদি মার্কিন সেনাদের সরাসরি স্থলভাগে যুদ্ধে মোতায়েন করা হয়। এ বিষয়টি মার্কিন ভোটারদের ট্রাম্পের পক্ষ থেকে বিমুখ করতে পারে, বিশেষ করে যারা ট্রাম্পের প্রতি আংশিক ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ এবং বিদেশী শাসন পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন।
জর্জিয়ার ডেকাটুর কাউন্টির জিওপি ভাইস চেয়ারম্যান জেসি উইলিয়ার্ড আশঙ্কা করেন যদি যুদ্ধ আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে শেষ না হয় তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। কিন্তু অন্যান্য জিওপি কাউন্টি চেয়ারম্যানরা নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই প্রাথমিক বিভাজন দেখতে পাচ্ছেন, যার মূল কারণ হলো ক্রমবর্ধমান খরচ, যা ইতোমধ্যে ব্যবসা ও ভোক্তাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফিনিক্স মেট্রো এলাকায় মারিকোপা কাউন্টির চেয়ারম্যান বারল্যান্ড বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালানো আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
বারল্যান্ড বলেন, ‘‘আমরা এমনকি পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে প্রচার চালাচ্ছি এবং নিবন্ধিত রিপাবলিকানরা দরজা থেকে চিৎকার করে বলছে, ‘চলে যান, নাহলে আমি পুলিশ ডাকব’। আমি বিষয়টিকে খুবই হতাশাজনক বলে মনে করি।”
গ্রামীণ আমেরিকা-জুড়ে এই দুর্ভোগ আরো তীব্র। পেনসিলভানিয়া, নর্থ ডাকোটা এবং অন্যান্য কৃষিপ্রধান রাজ্যের কৃষকরা হরমুজ প্রণালীর বিশৃঙ্খলার প্রভাব অনুভব করছেন, যার ফলে রোপণ মৌসুমের ঠিক আগে সারের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। কিছু উৎপাদককে শেষ মুহূর্তে তাদের পরিকল্পনা পাল্টে এমন নতুন ফসল রোপণ করতে হয়েছে, যা সারের ওপর কম নির্ভরশীল।
নর্থ ডাকোটা ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি ম্যাট পারডিউ বলেন, এই তাড়াহুড়োর কারণে ফসলের ফলন কম হতে পারে, যার সম্ভাব্য অর্থ হলো এই গ্রীষ্মে খাদ্যপণ্যের দাম আরো বেড়ে যাওয়া। কৃষকরা দীর্ঘ দিন ধরে জিওপি এবং ট্রাম্পের প্রতি অনুগত। কিন্তু শুল্কের কারণে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং বিদেশের যে বাজারগুলোতে তারা তাদের ফসল বিক্রি করতে পারত, সেগুলো উবে গেছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধটি এখন আরেকটি বিশাল আর্থিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পারডিউ বলেন, ‘আমরা যে বাজারগুলো থেকে কিনি এবং যেখানে বিক্রি করি, সেখানে এমনিতেই অনেক অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা রয়েছে এবং সামনে এগোনোর সাথে সাথে আমরা আরো অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করছি।’
প্রায়ই ট্রাম্প-সমর্থিত আমেরিকান ফার্ম ব্যুরোসহ বেশ কয়েকটি কৃষক সংগঠন গত সপ্তাহে হোয়াইট হাউজের কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করেছে এবং কৃষি লবি ক্রমবর্ধমান সারের খরচ মেটাতে কংগ্রেসের কাছে একটি বিশেষ সহায়তা প্যাকেজের অনুরোধ করছে।
পেনসিলভানিয়ার মনরো কাউন্টির জিওপি চেয়ারম্যান পিট বেগলি স্বীকার করেছেন যে, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং উচ্চ মূল্য তার সম্প্রদায়ের কিছু মানুষকে সমস্যায় ফেলছে।
কিছু রিপাবলিকান আশঙ্কা করছেন যে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এই যুদ্ধ কট্টর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ সমর্থকদের ভোটদানের হার কমিয়ে দেবে। দেশজুড়ে সরকারি দলের কৌশলবিদ এবং কাউন্টি চেয়ারম্যানরা বলেছেন, এটি এখনো কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট নয়। তারা এখনো প্রেসিডেন্টের ওপর আস্থা রাখতে ইচ্ছুক আপাতত; কিন্তু এর পরিণতিকে উপেক্ষা করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিশিগানের মনরো কাউন্টি রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান টড গিলম্যান বলেন, ‘এর শেষ পরিণতি কী? গ্যাসের দাম একটি সমস্যা। আমরা উদ্বিগ্ন যে, এটি মধ্যবর্তী নির্বাচনকে কিভাবে প্রভাবিত করতে পারে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে কিছু বলছেন না।’
এই মাসে পলিটিকোর একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে অনুগত ভোটাররা ইরান আক্রমণ সমর্থন করলেও কেউ কেউ বলছেন যে এটি ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নীতির লঙ্ঘন, এমনকি নতুন যুদ্ধ শুরু না করার ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ভঙ্গ করে। যুদ্ধ একটি প্রকৃত রাজনৈতিক ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, যদি আরো মার্কিন সৈন্য নিহত হয় অথবা সঙ্ঘাত অনেক বেশি দীর্ঘায়িত হয়।
অ্যারিজোনার মারিকোপা কাউন্টি রিপাবলিকান পার্টির চেয়ারম্যান ক্রেইগ বারল্যান্ড বলেন, ইরান যুদ্ধের ফলে ভবিষ্যতে রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোটার উপস্থিতি একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। ইরানের পরিস্থিতি এখনো পরিবর্তনশীল, এবং ট্রাম্প যেকোনো মুহূর্তে মার্কিন সমর্থন প্রত্যাহার করে দেশটির সম্পৃক্ততা শেষ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এ দিকে দীর্ঘস্থায়ী এই সঙ্ঘাত হোয়াইট হাউজের জীবনযাত্রার ব্যয় সংক্রান্ত বার্তাকে জটিল করে তুলছে, যা ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে, ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর বার্তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সফর করলেও বাস্তবে বাজার চড়ে যাচ্ছে। রিপাবলিকান পার্টির কৌশলবিদ বাজ জ্যাকবস বলেন, ‘এই ধরনের বড় ঘটনাগুলো সবকিছু গ্রাস করে ফেলতে পারে। এগুলো নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক পুঁজি শুষে নেয় এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের জন্য, অন্য কোনো কৌশলগত লক্ষ্যের ওপর মনোযোগ দেয়া খুব কঠিন করে তোলে।’
যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প তেলের দাম দ্রুত কমে আসার আশ্বাস দিলেও তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং গ্যাসের দাম ধীরে ধীরে প্রতি গ্যালন চার ডলারের জাতীয় গড়ের দিকে এগোচ্ছে। নেভাডার কার্সন সিটির জিওপি চেয়ার সুসান রুচ বলেন, ‘হ্যাঁ, এখন পরিস্থিতি কষ্টকর। গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধিতে কষ্ট সবাই উপলব্ধি করছি।’