সংসদের সর্বসম্মত ধন্যবাদ

Printed Edition
first-1
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীন থেকে ফিরে গতকাল জাতীয় সংসদে বক্তব্য রাখেন

সংসদ প্রতিবেদক

  • মালয়েশিয়া ও চীন সফরে দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষার চেষ্টা করেছি : প্রধানমন্ত্রী
  • বিদেশের সাথে সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সংসদে উপস্থাপন চাই : বিরোধীদলীয় নেতা

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের গত ২১ থেকে ২৬ জুনের মালয়েশিয়া ও চীন সফরের ‘অভূতপূর্ব সাফল্যের’ স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। সরকার এই সফরটিকে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে তুলে ধরেছে। অন্য দিকে, বিরোধী দল এই সফরের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভবিষ্যতে বিদেশের সাথে সম্পাদিত সব গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সংসদে উপস্থাপন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে সংসদের ভূমিকা আরো শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে।

গতকাল শনিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম কার্যদিবসে বাজেট আলোচনার শুরুতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। পরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম প্রস্তাবটি ভোটে দিলে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

প্রস্তাবটি উত্থাপন করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গঠিত গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের এই দুই দেশ সফর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হয়েছে এবং পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থের ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।’

তিনি জানান, সফরকালে চীনের সাথে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এ ছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সঙ্কটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে যাওয়া ও ফিরে আসার সময় জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনার প্রচলিত সংস্কৃতি বন্ধ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সাথে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজের দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছেন এবং পুরনো নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন।

ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক নীতিমালা পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের বাস্তব প্রতিফলন। এই সফরের মাধ্যমে বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের একটি নতুন মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, মালয়েশিয়ার সাথে শ্রমবাজার, জ্বালানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং চীনের সাথে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বাণিজ্য ভারসাম্য উন্নয়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার উল্লেখ করে তিনি বলেন, কিভাবে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে বাংলাদেশ থেকে রফতানি বাড়ানো যায়, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী বিমানবন্দরে জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিহার করে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নতুন একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছেন।

ধন্যবাদ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন করুক-এটাই বিরোধী দলের প্রত্যাশা। এ ক্ষেত্রে সরকারকে বিরোধী দল সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। তবে বিদেশের সাথে সম্পাদিত সব গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক চুক্তি সংসদে উপস্থাপন করতে হবে। সংসদকে পাশ কাটিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়; সংসদই রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। এতে জনপ্রতিনিধিরা চুক্তি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন আরো শক্তিশালী হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং রফতানি বহুমুখীকরণে আরো কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমানে তৈরী পোশাক ও জনশক্তির ওপর রফতানি নির্ভরশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী সফরে এসব বিষয় গুরুত্বের সাথে আলোচনা করেছেন।

পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেয়া হবে না। সবার আগে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো দেশকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে এবং নিজের স্বার্থ অক্ষুণœ রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।

রাজনীতিতে ইতিবাচক সংস্কৃতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দল সব কৃতিত্ব নেবে আর বিরোধী দল শুধু বিরোধিতা করবে এই সংস্কৃতিতে তারা বিশ্বাস করেন না। সরকারি দলকে যেমন বিরোধী দলকে সম্মান করতে হবে, একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকবে দেশ গঠনে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা।

ধন্যবাদ প্রস্তাবটি ভোটে দেয়ার আগে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। এ সফরের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আরো সুদৃঢ় হবে বলে সংসদের অভিমত। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সপক্ষে সফরটি অত্যন্ত বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, যা জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ১৯৭১ সালে বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অতীতে সব সরকার প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করতে পারেনি উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের ফলে দেশবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে এবং সাধারণ মানুষও সফরটি সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

পরে দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে অধিবেশনে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুপুর ১২টা ৫৯ মিনিটে স্পিকার ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার বিষয়টি তাকে অবহিত করলে প্রধানমন্ত্রী সংসদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আমাদের দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার। মালয়েশিয়া ও চীন সফরে আমি দেশের ও দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছি এবং সেই স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করেছি। এখানে আমাদের ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নেই। এ সফরে যদি ভালো কিছু অর্জিত হয়ে থাকে, তবে সেটি বাংলাদেশের অর্জন, এটি দেশের মানুষের অর্জন।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যে কারণে সংসদের পক্ষ থেকে আমাকে ধন্যবাদ জানানো হয়েছে, সে জন্য আমি সকল সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আমাদের দলের অবস্থান থেকে আমরা একটি স্লোগান ব্যবহার করি, সেটি হলো ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’।

প্রধানমন্ত্রী সংসদের সব সদস্যকে, বিশেষ করে বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতাকেও ধন্যবাদ জানাই। তিনিও দেশের মানুষের পক্ষে কাজ করার জন্য আমাদের উৎসাহ দিয়েছেন।’