ফ্রান্সে ভয়াবহ দাবানলে ঘর ছেড়েছে ১০ হাজার মানুষ
Printed Edition
মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন ফ্রান্স থেকে
তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ দাবানলে বিপর্যস্ত ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চল। দাবানলের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা পেতে ১০ হাজারের বেশি মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া, কয়েক সপ্তাহের অনাবৃষ্টি, প্রচণ্ড গরম এবং ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যাওয়া দমকা বাতাসের কারণে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফরাসি দমকল বাহিনী, সিভিল সিকিউরিটি, সেনাবাহিনীর সহায়তাকারী ইউনিট এবং স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
ফরাসি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের পিরেনিজ-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলের পাহাড়ি বনাঞ্চল থেকে শুরু হওয়া আগুন দ্রুত আশপাশের বন, কৃষিজমি ও বসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আগুন কয়েক হাজার হেক্টর এলাকায় বিস্তার লাভ করে। নিরাপত্তার স্বার্থে বহু সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং কয়েকটি এলাকার বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
দাবানল নিয়ন্ত্রণে কয়েকশ দমকলকর্মী, শতাধিক অগ্নিনির্বাপণ যান, হেলিকপ্টার এবং কানাডেয়ার ধরনের পানি নিক্ষেপকারী বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন হওয়ায় আকাশপথ থেকেই আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে তীব্র বাতাসের কারণে অনেক স্থানে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরও আবার নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে।
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং অসুস্থদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। অনেক পরিবার স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছে। স্থানীয় বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করছে।
আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে কয়েকজন দমকল সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে দু’জনের অবস্থা গুরুতর হলেও শঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ধোঁয়ায় আক্রান্ত হয়ে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ফ্রান্সের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি বিভাগে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি থাকায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নাগরিকদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্তদের পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়াযুক্ত স্থানে অবস্থান এবং সরাসরি রোদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দাবানলের প্রভাব পড়েছে কৃষি ও পর্যটন খাতেও। বহু আঙুরক্ষেত, ফলের বাগান এবং পশুচারণভূমি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের জনপ্রিয় পর্যটন এলাকায় হোটেল বুকিং বাতিলের ঘটনাও বেড়েছে। অনেক পর্যটককে নিরাপত্তার কারণে অন্য এলাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর দ্য ফ্রান্সের ওপরও দাবানলের প্রভাব পড়েছে। আয়োজকরা কয়েকটি রুটে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। প্রতিযোগীদের জন্য অতিরিক্ত পানীয়, বরফ, কুলিং জোন এবং চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে বিকল্প রুট ব্যবহারের পরিকল্পনাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী খরা, কম আর্দ্রতা এবং শুষ্ক বনাঞ্চল দাবানলের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। একসময় যে দাবানল মূলত গ্রীষ্মের শেষ দিকে দেখা যেত, এখন তা মৌসুমের শুরু থেকেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কার্যকর বন ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ জোরদার না হলে ভবিষ্যতে ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলে দাবানল আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
ফরাসি সরকার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। জরুরি সহায়তা তহবিল গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পুনর্বাসন এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত জনবল ও সরঞ্জাম পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না এলে আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।