যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ফের যুদ্ধ শুরু হতে পারে : ইরানের সতর্ক বার্তা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানের একজন সিনিয়র সামরিক কর্মকর্তা। দেশটির সেনাবাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড ‘খাতামুল-আমবিয়া’র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ জাফার আসাদি এ আশঙ্কার কথা জানান।

শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা ফার্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আবারো সঙ্ঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। তার দাবি, আগের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ওয়াশিংটন কোনো চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি যথাযথভাবে রক্ষা করে না।

সম্প্রতি ইরান তাদের প্রস্তাবিত একটি সংশোধিত চুক্তির খসড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই প্রস্তাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ইরানের সমালোচনা করেন। এর পরপরই তেহরানের পক্ষ থেকে এমন কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেল।

অন্য দিকে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরো জোরদার করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ইরান।

রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম প্রেস টিভির এক খবরে বলা হয়, আরব উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর ইরানি উপকূলবর্তী প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিগগিরই এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু হবে বলেও জানানো হয়েছে। আইআরজিসির বিবৃতিতে দাবি করা হয়, এ উদ্যোগের মাধ্যমে অঞ্চলটিকে নিরাপদ রাখা এবং দেশের জনগণের জন্য শক্তি ও গর্বের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য।

‘যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে’ ইরান যুদ্ধ শেষ হয়েছে : ট্রাম্প

তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, যুদ্ধবিরতি ইরানের বিরুদ্ধে শত্রুতা ‘সমাপ্ত’ করেছে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতির প্রয়োজন নেই, নিজের এই যুক্তিকে আরো জোরাল করতে গিয়ে এমন কথা বলেছেন তিনি।

রয়টার্স জানায়, শুক্রবার মার্কিন কংগ্রেসের নেতাদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের সাথে কোনো গুলি বিনিময় হয়নি। তিনি বলেছেন, “২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এ শুরু হওয়া যুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে।”

যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজুলুশন’ অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট ৬০ দিনের জন্য সামরিক অভিযান চালাতে পারেন, আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ‘যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্রবাহিনীর নিরাপত্তা বিষয়ে অনিবার্য সামরিক প্রয়োজনে’ কংগ্রেসের অনুমতি প্রার্থনা বা সময় আরো ৩০ দিন বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করতে পারেন।

দুই মাস আগে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার ৪৮ ঘণ্টা পর ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসকে যুদ্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছিলেন। তারপর থেকে শুরু হওয়া ৬০ দিনের সময়সীমা ১ মে শেষ হয়েছে। তারিখটি এগিয়ে আসার সময় কংগ্রেসের সহকারী ও বিশ্লেষকরা জানান, তারা ধারণা করছেন ট্রাম্প সময়সীমাটি এড়িয়ে যাবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার জানান, এ ক্ষেত্রে যুদ্ধ ক্ষমতা আইনের সময়সীমাটি প্রযোজ্য হবে না বলে অভিমত তাদের প্রশাসনের।

শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসি থেকে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা একটি যুদ্ধবিরতিতে ছিলাম, তাই এটি আপনাকে অতিরিক্ত সময় দিয়েছে।” কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ট্রাম্পের এই যুক্তি বাতিল করে দিয়ে বলেছেন, ১৯৭৩ সালের ওই আইনে যুদ্ধবিরতিকে অনুমোদন দেয়ার মতো কিছু নেই। আর ইরানের তেল রফতানির ওপর অব্যাহত মার্কিন নৌ-অবরোধ শত্রুতা চলার প্রমাণ, যুদ্ধবিরতির না।

ইয়েমেন উপকূলে তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা চলার মধ্যে ইয়েমেন উপকূলে তেলবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের খবর দিয়েছে সে দেশের কোস্টগার্ড। গতকাল শনিবার আলজাজিরা লিখেছে, শাবওয়া প্রদেশের উপকূলের কাছে অজ্ঞাত সশস্ত্র ব্যক্তিরা এমটি ইউরেকা নামের একটি তেলবাহী জাহাজ ছিনতাই করেছে বলে ইয়েমেনের কোস্টগার্ড জানিয়েছে। সশস্ত্র ওই ব্যক্তিরা জাহাজটি নিয়ন্ত্রয়ণে নেয়ার পর সেটিকে এডেন উপসাগরের দিকে, সোমালিয়ার নৌসীমা অভিমুখে নিয়ে যায়। এর আগে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স বলেছে, ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় মুকাল্লা বন্দর থেকে ৮৪ নটিক্যাল মাইল বা ১৫৫ কিলোমিটার দূরে থাকা একটি জাহাজ ‘সবুজ রঙের একটি ছোট নৌকা’ এবং ‘একটি মাছ ধরার জাহাজের’ সন্দেহজনক তৎপরতার কথা জানায়।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। তার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিম এশিয়ার যেসব দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে, সেসব দেশে হামলা চালায় ইরান। নিয়ন্ত্রণে নেয় হরমুজ প্রণালী। যুদ্ধের প্রায় দেড় মাস পর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামবাদের শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হয়। এরপরই পাল্টা ইরানের বন্দর ঘিরে হরমুজ অবরোধ করে যুক্তরাষ্ট্র। এ অবস্থায় এডেন উপসাগরে তেলবাহী জাহাজ ছিনতাইয়ের খবর দিলো আলজাজিরা। এর আগে ইরানকে সমর্থন দিয়ে ইয়েমেনের হাউছিরা ইসরাইলে মিসাইল হামলা চালায়। এপ্রিলের মাঝামাঝি তারা এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দেয়ার হুমকি দেয়। ইসরাইল গাজায় অভিযান শুরু করলে তখনো ইয়েমেনের হাউছিরালোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।

মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুর মতো’ আচরণ করছে

ইরানি বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ কার্যকর করতে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ আচরণ করছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দিন আগে সাগরে মার্কিন বাহিনী ইরানের কয়েকটি জাহাজ জব্দ করে, সে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প এ মন্তব্য করেন, জানিয়েছে রয়টার্স। ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেন, “আমরা জাহাজটি দখল করে নিই, আমরা পণ্যসম্ভার নিয়ে নিই, তেল নিয়ে নিই। এটি খুব লাভজনক ব্যবসা। “আমরা জলদস্যুদের মতো। আমরা অনেকটা জলদস্যুদের মতো কিন্তু আমরা খেলা খেলছি না।”