আভিজাত্যের আড়ালে ভিন্ন চেহারা

মিরপুরের ঈদবাজার

Printed Edition
back-4
শেষ মুহূর্তের ঈদের কেনাকাটা করছেন অনেকেই : নয়া দিগন্ত

হাবিবুল বাশার

আসন্ন ঈদুল ফিতর ঘিরে মিরপুরের শপিং জোনগুলো এখন ঈদ উৎসবের আমেজে মুখর। বিশেষ করে মিরপুর ১, ২, ১০ এবং ১২ নম্বর এলাকাগুলো এখন ক্রেতা-বিক্রেতার প্রধান মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। বড় বড় শপিং মলগুলোর সামনে সারি সারি দামি গাড়ির পার্কিং আর আলোকসজ্জা মিরপুরবাসীর কেনাকাটার সেই চিরচেনা আভিজাত্যকেই ফুটিয়ে তুলছে। তবে বাইরের এই চাকচিক্য আর আভিজাত্যের আড়ালে বাজারের ভেতরের চিত্রটি বেশ মিশ্র। বেনারসি পল্লী বা সনি স্কয়ারের মতো অভিজাত জায়গাগুলোতে উচ্চবিত্তের আনাগোনা থাকলেও, গত রমজানের সেই উপচে পড়া ভিড় বা কেনাকাটার তীব্র উন্মাদনা এবার কিছুটা স্তিমিত। অন্য দিকে, শাহ আলী প্লাজা বা মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটের মতো জায়গাগুলোতে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অবস্থা বেশ নাজুক। ক্রেতাদের পদচারণা থাকলেও প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ আশানুরূপ নয়। কেনাবেচার এই ভারসাম্যহীনতায় অনেক ছোট ব্যবসায়ীই এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

মিরপুর-১ ও ২: ব্র্যান্ড এবং আধুনিক লাইফস্টাইল : মিরপুর-১ ও ২ এলাকাটি মূলত ব্র্যান্ড সচেতন ক্রেতাদের জন্য স্বর্গরাজ্য। এখানে অবস্থিত আড়ং-এর বিশাল আউটলেটটি দেশীয় হস্তশিল্প, শাড়ি ও পাঞ্জাবির জন্য সেরা। আবার সনি স্কয়ার একটি আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স ও শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে পরিচিত, যেখানে নামী-দামি দেশী-বিদেশী ব্র্যান্ডের আউটলেট এবং স্টার সিনেপ্লেক্স রয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর শপিং সেন্টার এবং মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে গৃহস্থালি পণ্য থেকে শুরু করে সব ধরনের পোশাক বেশ সস্তায় পাওয়া যায়। গ্রামীণ চেক-এর শোরুমটি মূলত আরামদায়ক সুতি ও খাদি কাপড়ের জন্য প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়। এখানে পণ্যের দাম ব্র্যান্ড ভেদে মাঝারি থেকে উচ্চ হয়ে থাকে এবং মিরপুর-১, ২ ও পার্শ্ববর্তী কল্যাণপুর এলাকার ফ্যাশন সচেতন মানুষ ও তরুণরা প্রধান ক্রেতা।

মিরপুর-১০ : মধ্যবিত্তের কেনাকাটার প্রাণকেন্দ্র

মিরপুর-১০ গোলচত্বরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শাহ আলী প্লাজা এবং হোপ প্লাজা এই এলাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শপিং মল। শাহ আলী প্লাজা মূলত আধুনিক স্মার্টফোন, কম্পিউটার এক্সেসরিজ এবং সব ধরনের ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেটের জন্য বিখ্যাত। এ ছাড়া এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে থান কাপড়, কসমেটিকস এবং রেডিমেড থ্রি-পিস ও ছেলেদের শার্ট-প্যান্ট পাওয়া যায়। এই মার্কেটগুলোতে পণ্যের দাম মূলত মাঝারি ও সাশ্রয়ী, যেখানে ক্রেতারা দরদাম করে কেনাকাটা করার সুযোগ পান। মূলত মিরপুর ১০, ১১, কাজীপাড়া এবং শেওড়াপাড়া এলাকার মধ্যবিত্ত ও নি¤œ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের দৈনন্দিন ও উৎসবের কেনাকাটার জন্য এখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় করেন।

একদল কিশোরের সাথে দেখা মিলতেই জানতে চাওয়া হয় ঈদের কেনাকাটার বিষয়। একজন কিশোর বলে,পাঞ্জাবি কিনেছি একরকম। ঈদের দিন এক সাথে নামাজ পড়বো।

মিরপুর ১০-এর ব্যস্ত জংশন। চার দিকে উৎসবের কেনাকাটার ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যেই পরিচয় হলো এক মধ্যবয়সী রাইড শেয়ারিং চালকের সাথে। তিনি সেখানে নিজের জন্য আসেননি; এসেছিলেন তার আদরের ছেলে আর মেয়ের জন্য ঈদের কেনাকাটা করতে।

কেনাকাটার গল্প তুলতেই মানুষটি হঠাৎ কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। ধরা গলায় অকপটে জানালেন এক ত্যাগের কথা, সন্তানদের মুখে এক চিলতে হাসি ফোটাতে নিজের সামর্থ্য না থাকলেও এক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে এবার ঈদের আনন্দ জোগাড় করতে তার খরচ হয়েছে চার হাজার ৭০০ টাকা।

নিজের জন্য নতুন কী কিনলেন? এমন প্রশ্নের মুখে এক টুকরো ম্লান হাসি ফুটিয়ে নির্লিপ্ত স্বরে বললেন, ‘যা আছে, তাতে আল্লাহর রহমতে চলে যাবে।’ নিজের অপূর্ণতা আর ঋণের বোঝা আড়াল করে সন্তানদের আনন্দকেই যেন জীবনের পরম পূর্ণতা মনে করছেন এই সংগ্রামী বাবা।

মিরপুর বেনারসি পল্লী : আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের ঠিকানা

বিয়ের শাড়ি বা যেকোনো উৎসবের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের কথা বললে সবার আগে আসে মিরপুর বেনারসি পল্লীর নাম। মিরপুর-১০ থেকে কিছুটা ভেতরে অবস্থিত এই বিশাল এলাকাটি বেনারসি, কাতান, কাঞ্জিভরম এবং লেহেঙ্গার জন্য সারা দেশে বিখ্যাত। এখানকার শোরুমগুলোতে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা মূল্যের প্রিমিয়াম শাড়ি পাওয়া যায়। পণ্যের মূল্য সাধারণত উচ্চ, তাই মিরপুর ডিওএইচএস এবং ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকার উচ্চবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা স্পেশাল অকেশনের কেনাকাটার জন্য এখানে আসেন। এমনকি দেশের বাইরে থেকেও অনেক প্রবাসী বাঙালি এখানে শাড়ি কিনতে আসেন।

এক নামী-দামি শাড়ির দোকান মালিক বলেন, ঈদের বাজার বলে মনে হয় না। গতকাল বিক্রি করেছি ৪০ হাজার টাকা। গতবারের তুলনায় এবার কেনাবেচা ৬০ শতাংশ কম বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী।

মিরপুর-১২ ও পল্লবী : স্থানীয়দের ভরসার জায়গা

মিরপুর-১২ ও পল্লবী এলাকাটি মূলত আবাসিক হওয়ায় এখানকার মার্কেটগুলো স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদাকে প্রাধান্য দেয়। পল্লবী শপিং সেন্টার এবং ১২ নম্বর বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকাগুলোতে সাশ্রয়ী মূল্যের জুতা, কসমেটিকস এবং টেইলারিং শপ বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া ইজি (ঊধংু), লোটো (খড়ঃঃড়) বা এপেক্স (অঢ়বী)-এর মতো বড় ব্র্যান্ডের শোরুমগুলো মিরপুর-১২ এর প্রধান সড়কে অবস্থিত। এখানকার পণ্যের দাম সাধারণত সাশ্রয়ী থেকে মাঝারি সীমার মধ্যে থাকে। মিরপুর-১২, সাগুপ্তা এবং পল্লবী এলাকার আবাসিক বাসিন্দারা তাদের হাতের কাছে ভালো মানের পণ্য এবং ব্র্যান্ডের আউটলেটের জন্য এই জোনটির ওপর নির্ভর করেন।

মিরপুর পল্লবীর হাজী কুদরত আলী মোল্লা সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ‘ফ্যাশন ভিলা’। এর স্বত্বাধিকারী আব্দুল আলীম মূলত মেয়েদের বোরকা, হিজাব, খিমার, ওড়না, কোটস (শর্ট বোরকা) এবং টু-পিস বোরকার ব্যবসা করেন। কাপড়ের ধরন সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, তাদের এখানে কটন, সøাব কটন, চেরি কটন, সিওয়াই কটন এবং পপকর্ন কটন কাপড়ের পোশাক পাওয়া যায়।

পণ্যের দাম সম্পর্কে আব্দুল আলীম বলেন, তাদের এখানে হিজাব ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা, কোটস ১৩০০ থেকে ১৮০০ টাকা এবং খিমার ১২০০ থেকে ১৪০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। কেনাবেচার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমাদের এসব পণ্য বারো মাসের হলেও শবে বরাত থেকে রমজানের আগ পর্যন্ত কেনাকাটার মূল চাপ থাকে। ঈদের যে বাজারটি হওয়ার কথা, সেটি মূলত রমজানের আগ মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেছে।’ তিনি আরো জানান যে, বর্তমানে কেনাবেচা মোটামুটি চললেও গত বছরের তুলনায় এবার বাজারের গতি কিছুটা ধীর বা ‘সেøা’ মনে হচ্ছে।

পল্লবীর নামী-দামি শোরুমগুলোর ভিড়ে দেখা মিললো তাহসিন ও তার বান্ধবীর। তারা মূলত আড়ং থেকে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছেন। তাহসিন নিজের জন্য দুই হাজার ৬৯০ টাকা দিয়ে একটি পাঞ্জাবি কিনেছেন এবং সাথে ১৩ টাকা দিয়ে একটি শপিং ব্যাগ নিয়েছেন।

একই শোরুমে আসা অন্য এক দম্পতি আড়ং থেকে প্রায় সাত হাজার ৮০০ টাকার কেনাকাটা করেছেন। তবে কেনাকাটা শেষে তাদের উভয়েরই একটি সাধারণ অভিযোগ ছিল বিপুল অঙ্কের টাকা দিয়ে পণ্য কেনার পরেও শপিং ব্যাগের জন্য আলাদাভাবে ১৩ টাকা নেয়াটা তাদের কাছে বেশ দৃষ্টিকটু ও অস্বস্তিকর মনে হয়েছে।